ভালোবাসা দিবস এলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে দূরের কোনো শহর, নদীর তীরে হাঁটা, আলো ঝলমলে রাস্তা, অথবা সমুদ্রের ওপর সূর্যাস্ত। এই কল্পনার কেন্দ্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে ইউরোপ। ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার বিশেষ নান্দনিকতা, সব মিলিয়ে ইউরোপ বহুদিন ধরেই বিশ্ববাসীর কাছে “রোমান্সের মহাদেশ”।
আন্তর্জাতিক পর্যটন জরিপগুলোও একই কথা বলে, ভ্যালেন্টাইন উপলক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে রোমান্টিক শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকে ইতালি ও ফ্রান্সের একাধিক শহর, বিশেষ করে ভেনিস, প্যারিস ও সান্তোরিনি নিয়মিতভাবে শীর্ষ তিনে জায়গা করে নেয়।
রোমান্সের প্রতীক শহর
বিশ্বে “ভালোবাসার শহর” নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত প্যারিস। আইফেল টাওয়ার সামনে প্রেম নিবেদন, সেইন নদীর তীরে হাঁটা ও মন্টমার্ত্রের ক্যাফেতে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার।এই অভিজ্ঞতাগুলোই শহরটিকে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতীক বানিয়েছে। সূর্যাস্তের পর শহরের আলো নদীতে প্রতিফলিত হয়ে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে,যা পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিনের আকর্ষণ। সম্প্রতি প্যারিসে “প্রপোজাল ট্যুরিজম” বা পরিকল্পিত প্রেম নিবেদন ব্যবসাও দ্রুত বেড়েছে; দম্পতিরা হাজার হাজার ইউরো ব্যয় করে স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করছেন, যা শহরটির রোমান্টিক ইমেজ আরও শক্তিশালী করছে।
জলের শহর ও প্রেমের ভাসমান গল্প
ভেনিসকে অনেকে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক শহর বলেন। সরু খাল, গন্ডোলা ভ্রমণ ও পানির ওপর ভাসমান প্রাসাদ, এই বৈশিষ্ট্যগুলোই শহরটিকে হানিমুনের স্বপ্নের গন্তব্য বানিয়েছে। জরিপে ভেনিস বহুবার প্যারিসকেও ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে রোমান্টিক শহর হিসেবে প্রথম হয়েছে।
সূর্যাস্তের দ্বীপ
সাদা-নীল স্থাপত্য, পাহাড়ের ধারে বাড়ি আর এজিয়ান সাগরের ওপর সূর্যাস্ত, সান্তোরিনি আধুনিক যুগের “ইনস্টাগ্রাম রোমান্স” এর প্রতীক। হানিমুন পর্যটকদের কাছে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউরোপীয় দ্বীপগুলোর একটি।
ইতিহাস ও শিল্পের রোমান্স
ইতালির এই শহরগুলোতে প্রেমের রূপটা ভিন্ন, এখানে রোমান্স মানে কেবল দৃশ্য নয়, অভিজ্ঞতা। প্রাচীন স্থাপত্যের সামনে হাঁটা, শিল্পকলা ও সংগীত ও ধীর জীবনযাত্রা, জরিপে ইতালির তিন শহর একসঙ্গে শীর্ষ দশে থাকায় বোঝা যায়, রোমান্টিক পর্যটনে দেশটি বিশেষ প্রভাব রাখে।
নতুন প্রজন্মের রোমান্টিক শহর
আধুনিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী শহরের পাশাপাশি নতুন গন্তব্যও জনপ্রিয় হচ্ছে। এডিনবরোতে ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্পা ও প্রকৃতির সমন্বয় থাকায় অনেক তালিকায় এটি প্যারিসের চেয়েও বেশি রোমান্টিক হিসেবে উঠে এসেছে।
যে কারণে ইউরোপ-ই রোমান্সের কেন্দ্র
বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন, হাজার বছরের স্থাপত্য প্রেমকে “নাটকীয়” করে তোলে, যা আধুনিক শহরে কম পাওয়া যায়। ইউরোপীয় শহরগুলো হাঁটার উপযোগী, প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য আদর্শ পরিবেশ। ক্যাফে সংস্কৃতি, ডিনার, সংগীত, সবই সম্পর্ককে সময় দেয়। ভ্যালেন্টাইন মৌসুমে বিশেষ প্যাকেজ, প্রপোজাল আয়োজন, স্পা-ডিনার, সবই রোমান্সকে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী করেছে।
নতুন চ্যালেঞ্জ
অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে ইউরোপের অনেক শহর এখন ট্যুরিস্ট ট্যাক্স চালু করেছে, ভেনিস, প্যারিস, রোম, সান্তোরিনির মতো জনপ্রিয় জায়গায় ভ্রমণ ব্যয় বাড়ছে। এতে বোঝা যায়, ভালোবাসার গন্তব্য হিসেবে ইউরোপের আকর্ষণ এতটাই বেশি যে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হচ্ছে।
শেষ কথা
ভ্যালেন্টাইন মানে শুধু ফুল বা ডিনার নয়, একটি অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে পূর্ণ রূপ পাওয়া যায় ইউরোপে। প্যারিসের আলো, ভেনিসের জল, সান্তোরিনির সূর্যাস্ত কিংবা এডিনবরোর পাহাড়, সব মিলিয়ে ইউরোপের রোমান্স আসলে একটি অনুভূতি, যা শুধু দেখার নয়, বাঁচার। তাই বিশ্বজুড়ে দম্পতিদের কাছে ভালোবাসা দিবসের স্বপ্নের মানচিত্রে ইউরোপ এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।


