১ মার্চ থেকে ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তন কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফরাসি আশ্রয় দপ্তর আর আবেদনকারীদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য মূল নথি নিজেদের হেফাজতে রাখবে না। এতদিন ধরে আশ্রয় আবেদন জমা দেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রেই আবেদনকারীদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ বা ভ্রমণসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হতো এবং প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ফেরত পাওয়া যেত না। এই প্রথা পরিবর্তন করে এখন থেকে নথিগুলো আবেদনকারীর কাছেই থাকবে, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী কপি বা ডিজিটাল স্ক্যান সংরক্ষণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও মানবিক করা এবং আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত নথির ওপর তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
ফ্রান্সে আশ্রয় প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ফরাসি শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুরক্ষা দপ্তর (ওএফপিআরএ)। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই আবেদনকারীদের পরিচয় যাচাই, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এতদিন আশ্রয় আবেদন জমা দেওয়ার সময় অনেক আবেদনকারীকে তাদের মূল পাসপোর্ট জমা দিতে হতো, যাতে পরিচয় যাচাই ও সম্ভাব্য প্রতারণা রোধ করা যায়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের দৈনন্দিন জীবনে জটিলতা তৈরি করত, বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব খোলা, ভাড়া বাসা নেওয়া বা অন্য প্রশাসনিক কাজে পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হলে সমস্যায় পড়তে হতো। নতুন সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, মূল নথি জব্দ না করে বরং প্রয়োজনীয় কপি সংরক্ষণ ও যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জানিয়েছে যে এই পরিবর্তন প্রশাসনিক আধুনিকায়নের অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়েছে, ফলে কাগজপত্রের শারীরিক হেফাজতের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। আবেদনকারীরা এখন অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন, নথি আপলোড করতে পারেন এবং তাদের আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে পাসপোর্ট ও মূল নথি দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করার পুরনো পদ্ধতি আর প্রয়োজনীয় নয় বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, আবেদনকারীদের অধিকার সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বহুদিন ধরেই আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নথি জব্দের প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তাদের মতে, যেসব ব্যক্তি যুদ্ধ, নির্যাতন বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসেন, তাদের জন্য পাসপোর্টই প্রায়শই একমাত্র পরিচয় প্রমাণের মাধ্যম। সেটি দীর্ঘ সময়ের জন্য জমা রেখে দিলে আবেদনকারীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং সামাজিক-প্রশাসনিক সেবা গ্রহণে বাধার সম্মুখীন হন। নতুন নীতিতে অন্তত এই মানসিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলে সংগঠনটি মনে করছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। কিছু আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারক মনে করছেন, মূল নথি নিজেদের কাছে না রাখলে পরিচয় গোপন বা ভুয়া তথ্য দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যখন ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তখন পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর রাখা জরুরি বলে তারা মত দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন আশ্রয়ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হয়। তাই নথি জব্দ না করে কীভাবে একই মাত্রার যাচাই নিশ্চিত করা হবে, এ প্রশ্নের উত্তর বাস্তবায়নের পরেই স্পষ্ট হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বৃহত্তর ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশ্রয় ও অভিবাসন নীতিতে সংস্কারের আলোচনা জোরদার হয়েছে। নতুন কাঠামোতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, সীমান্তে দ্রুত স্ক্রিনিং এবং ফেরত পাঠানোর নিয়ম শক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত একদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার করছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য খোঁজা হচ্ছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বাস্তব প্রভাব কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন থেকে আবেদনকারী তাদের পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন, ফলে প্রয়োজনে দূতাবাসে যোগাযোগ, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সহজ হবে। অনেকেই অভিযোগ করতেন যে নথি ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, কখনও কখনও প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হতো না। নতুন ব্যবস্থায় সেই জটিলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, যদি কোনও ক্ষেত্রে জালিয়াতির সন্দেহ থাকে বা নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
ফ্রান্সে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়, প্রথমে প্রিফেকচারে নিবন্ধন, এরপর ‘ওএফপিআরএ’-তে সাক্ষাৎকার ও সিদ্ধান্ত, এবং প্রয়োজনে আপিলের সুযোগ। আপিলের ক্ষেত্রে আবেদনকারী জাতীয় আশ্রয় অধিকার আদালত (সিএনডিএ)-তে যেতে পারেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাই একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। তাই নতুন নীতির অধীনে নথির কপি সংরক্ষণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং ইউরোপীয় ডেটাবেসে তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। ফ্রান্সে অভিবাসন প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দাবি, অন্যদিকে মানবিক নীতির আহ্বান, এই দুই প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ। মূল নথি জব্দ না করার সিদ্ধান্ত একদিকে মানবাধিকারবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে এটি প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিকায়নের প্রতিফলন হিসেবেও উপস্থাপিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিগত পরিবর্তন ফ্রান্সের আশ্রয়ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করছে। এটি আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুততর করার প্রচেষ্টার অংশ। বাস্তবে এর প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা যাচাইয়ের মান এবং আবেদনকারীদের প্রতি আচরণের ওপর। তবে আপাতত বলা যায়, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য পাসপোর্ট ও মূল নথি নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ নিশ্চিত করা ফ্রান্সের আশ্রয় নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেই বিবেচিত হবে।


