ইউরোপের অন্যতম উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দেশ ফ্রান্স-এ সামনে এসেছে এক বিস্ময়কর ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। মাত্র ৯ বছর বয়সী এক শিশু প্রায় দুই বছর ধরে একা একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেছে, অথচ দীর্ঘ সময় বিষয়টি পরিবার, প্রতিবেশী, স্কুল এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যায়। এই ঘটনা দেশটিতে শিশু অধিকার, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক নজরদারি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট শহর নেরসাক -এ ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। শিশুটির মা নতুন সঙ্গীর সঙ্গে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। তিনি মাঝে মাঝে এসে কিছু খাবার রেখে যেতেন, কিন্তু বাস্তবে শিশুটি অধিকাংশ সময় সম্পূর্ণ একাই থাকত।
স্থানীয় তদন্তে জানা যায়, শীতে ঘরে পর্যাপ্ত গরমের ব্যবস্থা ছিল না। অনেক সময় বিদ্যুৎ ও গরম পানি না থাকায় নিয়মিত রান্না হতো না এবং শিশুটি নিজের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা করত। খাবারের জন্য তাকে, কেক, টিনজাত খাবার, প্রতিবেশীর বাগানের টমেটো নিয়ে দিন পার করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, শিশুটি নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকত এবং পড়াশোনায়ও স্বাভাবিক আচরণ করত। শিক্ষকদের কাছে সে পরিচ্ছন্ন ও শান্ত স্বভাবের ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ফলে কেউ বুঝতেই পারেনি সে একা বসবাস করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় অবহেলিত শিশুরা সামাজিকভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শিখে যায়, এটিই এই ঘটনায় ঘটেছে।
ধীরে ধীরে স্থানীয় মেয়র ও কিছু প্রতিবেশীর সন্দেহ হয় যে শিশুটি প্রায়ই একা থাকে। পরে প্রশাসন ও পুলিশকে জানানো হলে ২০২২ সালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। শিশুটিকে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সামাজিক সেবার তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসা-মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়া শুরু হয়।
তদন্ত শেষে আদালত শিশুটির মা-কে শিশু পরিত্যাগ (অপ্রাপ্তবয়স্ককে অবহেলায় ফেলে রাখা) অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেয়। আদালত মন্তব্য করে, সন্তানের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অভিভাবকের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব, এটি অবহেলা নয়, গুরুতর অপরাধ।
এই ঘটনাটি ফ্রান্সজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে কয়েকটি কারণে, ফ্রান্সে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী বলে ধরা হয়। তবু একটি শিশু দুই বছর একা থাকতে পারা বড় প্রশ্ন তুলেছে। শিশুটি প্রতিদিন স্কুলে গেলেও শিক্ষকরা বুঝতে পারেননি, মানে শিশুর মানসিক অবস্থা সবসময় বাহ্যিক আচরণে বোঝা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নগরজীবনে প্রতিবেশী যোগাযোগ কমে যাওয়ায় অনেক সমস্যা দীর্ঘদিন অদৃশ্য থাকে।
শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ একাকীত্ব শিশুদের মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে নিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যৎ সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌথ নজরদারি প্রয়োজন।
এই ঘটনা শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপজুড়েই শিশু সুরক্ষা কাঠামো পুনর্বিবেচনার আলোচনা শুরু করেছে।
বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, পরিবারের বাইরে সমাজ কতটা দায়িত্ব নেবে?
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে দুই বছর ধরে একটি শিশু একা বসবাস করতে পারা কেবল পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক নজরদারি, প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক যোগাযোগের ঘাটতির বড় উদাহরণ। এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, শিশু নিরাপত্তা শুধু আইনের বিষয় নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব।


