ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোর করার উদ্দেশ্যে এক বছর আগে চালু করা হয়েছে ‘রোতাইয়ো সার্কুলার’। সরকার এই নীতির মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সফল হলেও, অভিবাসীদের জীবনে ভোগান্তি এবং অনিশ্চয়তার মাত্রা তীব্র হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে অনিয়মিতদের নিয়মিতকরণ হার ৪২ শতাংশ কমেছে, আর বিশেষভাবে কাজের ভিত্তিতে নিয়মিতকরণ কমেছে ৫৪ শতাংশ। সংকটাপন্ন পেশার আওতায় মাত্র ৬৬৬টি রেসিডেন্স পারমিট দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত গল্পে ভোগান্তি
কঙ্গোলিজ নাগরিক লাদজি (৩৮) ২০১৬ সাল থেকে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। তিনি প্যারিসের একটি রেস্তোরাঁয় ফুলটাইম চাকরি করছেন এবং ফরাসিও সাবলীলভাবে বলেন। তবুও, নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে তার আবেদন বারবার আটকে যাচ্ছে। লাদজি বলেন, আমি সব বেতন রশিদ, কাগজপত্র খুব যত্ন করে রেখেছি। প্রশাসন ছোট একটি কাগজের অভাব দেখিয়েও ফাইল বাতিল করতে পারে, তাই কিছুই ফেলি না। তার সমস্যা, ডিশ ওয়াশারের কাজ ফ্রান্সের সংকটাপন্ন পেশার তালিকায় নেই। ফলে দীর্ঘ বছরের চাকরি থাকা সত্ত্বেও বৈধতা পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। প্রতিটি আবেদন জমা দেওয়ার জন্য তাকে প্রায় ৭০০ ইউরো খরচ করতে হয়েছে আইনজীবীর ফি হিসেবে। অন্য অভিবাসী এদউইজ (৪১) বলেন, আমি ভয় পাই, হয়তো আজীবন অনিয়মিতই থেকে যাব। আমাদের কোনো অধিকার নেই, ভ্রমণ করতে পারি না, ঘর ভাড়া নিতে পারি না, মনে হয় আমাদের কোনো জীবনই নেই।
‘রোতাইয়ো সার্কুলার’-এর কড়াকড়ি
২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রোতাইয়ো একটি সার্কুলারের মাধ্যমে অনিয়মিতদের নিয়মিতকরণ কঠোর করেন। নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, বিশেষ শর্তে বৈধতা পেতে হলে অন্তত, সাত বছর ফ্রান্সে থাকার প্রমাণ, ফরাসি ভাষায় দক্ষতার সনদ ও কোনো ওকিউটিএফ (ফ্রান্স ত্যাগের বাধ্যবাধকতা) না থাকা। এর পাশাপাশি শ্রমিক সংকটে থাকা কিছু পেশার জন্য সীমিত নিয়মিতকরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এটি ফ্রান্সের ৮০টি নির্দিষ্ট পেশার জন্যই প্রযোজ্য, যার বাইরে থাকা শ্রমিকদের জন্য সুযোগ সীমিত।
পরিসংখ্যান ও প্রভাব
২০২৫ সালে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণ কমেছে ৪২ শতাংশ। কাজের ভিত্তিতে বৈধকরণ কমেছে ৫৪ শতাংশ, শুধুমাত্র সংকটাপন্ন পেশার আওতায় ৬৬৬টি পারমিট দেওয়া হয়েছে। প্রেফেকচুরগুলোর দীর্ঘসূত্রতা, জনবল সংকট ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত। উদাহরণস্বরূপ, সেন-সাঁ-দেনি’র (৯৩) ২০২২ সালের শেষের দিকের ফাইল এখনও প্রক্রিয়াধীন। শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি-এর অভিবাসী শ্রমিক শাখার সদস্য জঁ-আলবের গিদু বলেন, রোতাইয়ো সার্কুলার ফরাসি প্রশাসনের প্রেফেরা খুবই গুরুত্ব সহকারে অনুসরণ করছে। বৈধতার হারে এই পতন তারই সরাসরি ফল। আজীবন ওকিউটিএফ দেওয়া হচ্ছে, যা অনিয়মিতদের জন্য ভয়াবহ।
মানবিক ও সামাজিক প্রভাব
অভিবাসীরা শুধু বৈধতা হারাচ্ছেন না; জীবনযাত্রা, চাকরি, ভাড়া এবং সামাজিক সেবা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। নবায়নেও জটিলতা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নিয়মিতকরণের উচ্চ ব্যয় তাদের জীবনকে অনিশ্চিত ও মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রাখছে। লাদজি’র ভাষায়, অনিয়মিত অবস্থায় জীবন খুব কঠিন। এটা মাথার ভেতর সব সময় একটা বোঝা হয়ে থাকে, ঘুমাতে দেয় না। মানবাধিকার সংগঠন ‘সিএসপি৭৫’এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ অবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা বলছে, সরকারের কড়াকড়ি অভিবাসীদের মানবিক অধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশ্লেষণ
ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা লক্ষ্য কিছুটা অর্জিত হলেও, মানবিক সংকট ও সামাজিক বিভাজন বাড়ছে। অভিবাসীরা দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা না পেলে কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও সামাজিক অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘রোতাইয়ো সার্কুলার’ রাজনৈতিকভাবে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রদর্শন করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি অভিবাসন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বা মানবিক সমাধান নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত।


