বিশ্বজুড়ে যখন খাদ্য অপচয় একদিকে পরিবেশ বিপর্যয়, অন্যদিকে ক্ষুধার বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্ট করছে, তখন আবার আলোচনায় এসেছে ফ্রান্স-এর বহুল আলোচিত খাদ্য আইন। ২০১৬ সালে কার্যকর হওয়া এই আইনের মাধ্যমে বড় সুপারমার্কেটগুলোকে অবিক্রীত কিন্তু খাওয়ার উপযোগী খাবার ফেলে দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয় এবং সেগুলো দাতব্য সংস্থা ও খাদ্যব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটের কারণে আইনটি আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সামাজিক সহায়তা নয়, জলবায়ু নীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
আইনে যা আছে
আইন অনুযায়ী, ৪০০ বর্গমিটারের বেশি আয়তনের সুপারমার্কেটকে স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ভোজ্য খাবার ফেলে দেওয়া নিষিদ্ধ, বিক্রি না হওয়া বা অতিরিক্ত মজুত খাদ্য দান করা ও ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার নষ্ট করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে দোকানগুলো এখন খাবার ধ্বংস করার বদলে পুনর্বণ্টন ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছে, আলাদা সংরক্ষণ, দ্রুত বাছাই ও প্রতিদিন সংগ্রহের সময়সূচি চালু করা হয়েছে।
যে কারণে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ
ইউরোপীয় তথ্য অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোতেই বিপুল খাদ্য অপচয় ঘটে, উৎপাদন ঘাটতির কারণে নয়, বরং বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থার কারণে। ফ্রান্সে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন টন খাদ্য নষ্ট হতো। অন্যদিকে একই সময়ে নিম্নআয়ের হাজার হাজার পরিবার খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই বৈপরীত্য থেকেই আইনটির জন্ম।
বর্তমানে খাদ্যব্যাংকগুলো নিয়মিত তাজা ফল, সবজি, রুটি, দুগ্ধজাত পণ্য ও প্রস্তুত খাবার পাচ্ছে, যা আগে প্রায় সবই ডাস্টবিনে যেত।
কতটা অপচয় কমেছে
সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই বলা হয় প্রতি বছর কোটি টন খাবার বাঁচছে, তবে নির্দিষ্ট এমন কোনো একক সংখ্যা সরকারি ভাবে নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন, খাদ্য পুনর্বণ্টন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, দাতব্য সহায়তা আরও স্থায়ী হয়েছে, অপচয় কমেছে, তবে পুরো খাদ্য ব্যবস্থার তুলনায় ধাপে ধাপে, অর্থাৎ আইনটি সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়, কিন্তু খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আচরণগত পরিবর্তন এনেছে, এটিই সবচেয়ে বড় প্রভাব।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
খাদ্য অপচয় মানেই শুধু খাবার নষ্ট হওয়া নয়, উৎপাদনের পানি ও জ্বালানি অপচয়, পরিবহন খরচের অপচয় ও ল্যান্ডফিলে মিথেন গ্যাস বৃদ্ধি। আইন কার্যকর হওয়ার পর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ কমেছে, কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করছে এবং সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার ব্যয়ও কমেছে। অর্থাৎ একই নীতিতে সমাজনীতি, অর্থনীতি ও জলবায়ু, তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে।
ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ধারণা
ফ্রান্স পথ দেখানোর পর, ইতালি কর-প্রণোদনা দিয়ে খাদ্য দান উৎসাহিত করেছে, স্পেন খাদ্য অপচয়বিরোধী আইন প্রণয়নের পথে গেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে। ফলে এটি এখন ওয়েলফেয়ার পলিসি নয়, সাসটেইনেবল ইকোনমি মডেল হিসেবে আলোচিত।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের কারণে আইনটি আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক দেশ এখন খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর চেয়ে অপচয় কমানোর দিকে নীতি নিচ্ছে কারণ গবেষণা বলছে, বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়। এই বাস্তবতায় ফ্রান্সের মডেলকে ক্ষুধা ও পরিবেশ, দুই সংকটের যৌথ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারকথা
ফ্রান্স প্রথম দেশ হিসেবে সুপারমার্কেটের অবিক্রীত খাবার দান বাধ্যতামূলক করে আইন করেছিল, তথ্যটি সঠিক। তবে এখন এটি আর একক উদাহরণ নয়; বরং একটি নীতি-ধারার সূচনা। খাদ্য পুনর্বণ্টন বাড়ানো, সামাজিক সহায়তা শক্তিশালী করা এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে আইনটি বিশ্বজুড়ে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


