ইউরোপের স্বপ্নের দেশ জার্মানি এখন আর অভিবাসীদের জন্য আগের মতো ‘উন্মুক্ত’ নয়। গত ৫ ডিসেম্বর জার্মানির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘বুন্ডেসটাগ’-এ পাস হওয়া একটি নতুন আইন দেশটির আশ্রয় নীতিতে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে আলজেরিয়া, ভারত, মরক্কো এবং তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো ‘নিরাপদ দেশ’-এর তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যা ওই সব দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জার্মানির দরজা প্রায় বন্ধ করে দিচ্ছে।
পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ও নতুন ক্ষমতা
জার্মানির আইনি কাঠামো অনুযায়ী, কোনো দেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করতে সাধারণত পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ বুন্ডেসরাট-এর অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু নতুন এই আইন অনুযায়ী, সরকার এখন থেকে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সরাসরি আইনি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যেকোনো দেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করতে পারবে। বুন্ডেসটাগে ৪৫৭ জন আইনপ্রণেতা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন এসপিডি ও সিডিইউ/সিএসইউ জোটের পাশাপাশি কট্টর ডানপন্থি এএফডি-ও এই কঠোর আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
‘নিরাপদ দেশ’ মানে কি?
আইনি পরিভাষায় ‘নিরাপদ দেশ’ বলতে বোঝায় এমন রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় কোনো নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঝুঁকি নেই। নতুন নিয়মে নিরাপদ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের আবেদনগুলোকে ভিত্তিহীন ধরে নিয়ে দ্রুত প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হবে। এসব দেশের নাগরিকদের আগেভাগেই জানিয়ে দেওয়া হবে যে তাদের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কোনো ব্যক্তি যদি তবুও আশ্রয় চান, তবে তাকে নিশ্চিত প্রমাণ দিতে হবে যে, কেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার দেশে ঝুঁকিতে আছেন।
রাষ্ট্রীয় খরচে আইনি সহায়তা
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি সহায়তার সুযোগ বন্ধ হওয়া। যাদেরকে নির্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বা দেশ ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তারা আর রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী পাবেন না। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া এই অধিকারটি মাত্র দেড় বছরের মাথায় বাতিল করে দেওয়া হলো।
নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে কঠোরনীতি
শুধু আশ্রয় নয়, যারা ইতিমধ্যে জার্মানির নাগরিকত্ব পেয়েছেন বা পেতে চাচ্ছেন, তাদের জন্যও খবরটি অস্বস্তির। জালিয়াতি, ঘুষ, দুর্নীতি বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করলে ১০ বছরের জন্য আবেদনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এমনকি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর জালিয়াতি ধরা পড়লেও একই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
ইউরোপীয় অভিন্ন আশ্রয়নীতি
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডট অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। জার্মানি এখন ‘কমন ইউরোপীয় অ্যাসাইলাম সিস্টেম’ বাস্তবায়নের দিকে এগুচ্ছে। এজন্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরের কাছে বড় আকারের সেকেন্ডারি মাইগ্রেশন সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, ডাবলিন নীতিমালা অনুযায়ী অন্য ইউরোপীয় দেশ হয়ে আসা অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো।
দ্বিতীয় শ্রেণীর আশ্রয় ব্যবস্থা ও সমালোচনা
সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়েছে গ্রিন পার্টি এবং বামপন্থি ডি লিংক। মানবাধিকার সংস্থা ‘প্রো আসুল’-এর মতে, রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা বাতিল করার মাধ্যমে সরকার প্রকারান্তরে বেআইনি নির্বাসন এবং অন্যায় আটকের পথ সুগম করছে। অন্যদিকে, গির্জা ও বিভিন্ন অভিবাসী সংগঠন মনে করছে, এই নীতি জার্মানির মৌলিক আইনগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
বর্তমান নিরাপদ দেশের তালিকা
বর্তমানে জার্মানির তালিকায় থাকা নিরাপদ দেশগুলো হলো-ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল সদস্য রাষ্ট্র, আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, জর্জিয়া, ঘানা, কসোভো, উত্তর মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, মলদোভা, সেনেগাল, সার্বিয়া এবং নতুন যুক্ত হওয়া ভারত, আলজেরিয়া, মরক্কো ও তিউনিশিয়া।
বাংলাদেশিদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
যদিও বর্তমান তালিকায় বাংলাদেশকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তবে নতুন আইনের কাঠামো বাংলাদেশিদের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। নতুন আইনে যেহেতু এখন আর উচ্চকক্ষ (বুন্ডেসরাট)-এর অনুমোদন লাগছে না, তাই জার্মান সরকার চাইলে যেকোনো সময় প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এমনটি হলে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। বর্তমানেও যারা ব্যক্তিগত নির্যাতনের পরিবর্তে কেবল অর্থনৈতিক কারণে বা উন্নত জীবনের আশায় আশ্রয় চাচ্ছেন, তাদের আবেদনগুলো স্পষ্টতই ভিত্তিহীন হিসেবে দ্রুত বাতিল করার প্রবণতা বাড়বে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ আফগানদের মতো অন্যান্য দেশের শরণার্থীদেরও পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া স্থগিত বা সীমিত করা হচ্ছে। এটি অনেক বাংলাদেশি পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
আইনি জটিলতা
আইনটি কঠোর করার ফলে একজন আশ্রয়প্রার্থী নানা ধরনের আইনি প্যাঁচগুলোর মুখোমুখি হতে পারেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো ‘স্টেট-ফান্ডেড লিগ্যাল এইড’ বা রাষ্ট্রীয় খরচে আইনি সহায়তা বন্ধ হওয়া। একজন বিদেশি হিসেবে জার্মানির জটিল আইন একা মোকাবিলা করা অসম্ভব। নিজের টাকা দিয়ে আইনজীবী নিয়োগ করার সামর্থ্য অনেকের থাকে না, যার ফলে তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেয়েই নির্বাসিত হতে পারেন। ‘নিরাপদ দেশ’ থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য এখন শুধু নিজের বিপদ বলা যথেষ্ট নয়, বরং কেন রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দিতে পারছে না তার ‘নিশ্চিত প্রমাণ’ দিতে হবে। রাজনৈতিক মামলা বা নির্যাতনের নথি ছাড়া এখন আর কেবল মৌখিক দাবিতে কাজ হবে না। নতুন আইনের লক্ষ্য হলো আশ্রয় প্রক্রিয়া গতিশীল করা। এর মানে হলো, আগে একটি আবেদন খারিজ হওয়ার পর আপিল করে মাসের পর মাস থাকা যেত, এখন সেই আপিল চলাকালীন সময়েও ব্যক্তিকে নির্বাসন কেন্দ্রে রাখা বা দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সরকার পেতে যাচ্ছে।
নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাসের ঝুঁকি
যারা ইতিমধ্যে বৈধভাবে আছেন বা নাগরিকত্বের আবেদন করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত হয়েছে। আবেদনের সময় ছোটখাটো তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দিলে এবং তা পরে প্রমাণিত হলে, ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা আসবে। এমনকি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সেটি বাতিলও হতে পারে। যদি কোনো বাংলাদেশি আগে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে (যেমন: ইতালি বা গ্রিস) আঙুলের ছাপ দিয়ে থাকেন, তবে তাকে এখন অনেক দ্রুত ওই দেশে ফেরত পাঠানো হবে। জার্মানির নতুন সেকেন্ডারি মাইগ্রেশন সেন্টারগুলো মূলত এই কাজই করবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানির এই কঠোর নীতির মুখে টিকে থাকতে হলে, ভুয়া নথি বা মিথ্যা গল্পের আশ্রয় না নিয়ে প্রকৃত ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকলে তা মজবুতভাবে উপস্থাপন করতে হবে। যেহেতু সরকারি আইনি সহায়তা বন্ধ, তাই ‘প্রো আসুল’ বা চার্চ ভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আশ্রয়ের পরিবর্তে কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকলে সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
জার্মান সরকারের এই নতুন পদক্ষেপের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো দেশটিকে আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে ‘কম আকর্ষণীয়’ করে তোলা। অভিবাসন স্রোত কমাতে আইনি ব্যবস্থার এই কড়াকড়ি শেষ পর্যন্ত মানবিক আবেদনগুলোকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


