২০২৫ সালের সমাপ্ত তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)‑এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে বছরজুড়ে কমপক্ষে ৭ হাজার ৬৬৭ জন মানুষ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অভিবাসন রুটে মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে, এই হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ জন জীবনের নিরাপত্তা হারিয়েছে।
এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হলেও, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২০০ জন অভিবাসী মারা গিয়েছিল, এটি মূলত তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা এবং কিছু অঞ্চলে পর্যবেক্ষণের অভাবে কম প্রতিফলিত হয়েছে বলে আইওএম উল্লেখ করে। যখন বাস্তবে বহু মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি, বিশেষত সাগর পথে সংঘটিত বিপজ্জনক যাত্রার ক্ষেত্রে, তখন প্রকৃত সংখ্যা এটিকে ছাড়িয়ে থাকতে পারে।
মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রদর্শন করে যে ২০২৫ সালেও অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী যাত্রাপথ কত বিপজ্জনক রয়ে গেছে। ভূমধ্যসাগর, পশ্চিম আফ্রিকা ও আটলান্টিক সহ বিভিন্ন দূরপথে সমুদ্রপথের যাত্রা এখনো ভয়ঙ্কর অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে কমপক্ষে ২দ হাজার ১৮৫ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন এবং ক্যানারি দ্বীপ সমীপে গত বছর ১ হাজার ২১৪ জন মৃত্যু বা নিখোঁজের হিসাব দেখানো হয়েছে।
এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান শুধু সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ নয়, এশিয়া এবং পূর্ব রুটে অভিবাসনকে কেন্দ্র করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগানিস্তান, ইথিওপিয়া সহ বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য এই রুটগুলি নিয়মিতভাবে প্রাণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইওএম‑এর রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০২৫ সালে মৃত্যু ও নিখোঁজের এই পরিমাণ সম্পূর্ণ চূড়ান্ত সংখ্যা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই রক্ক্রাই বা ডকুমেন্টেড তথ্যের অভাবে সত্যিকারের পরিস্থিতি পুরোপুরি জানা যায়নি। এ ধরনের অব্যক্ত বা ‘অনির্ধারিত’ ঘটনাগুলি অন্তর্ভুক্ত করলে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর আইওএম‑এর পরিচালক জেনারেল অ্যামি পোপ বলেন, যাত্রাপথে জীবনের এই ধারাবাহিক ক্ষতি একটি বিশ্বব্যাপী ব্যর্থতা যার সঙ্গে আমরা কখনোই সহমত পোষণ করতে পারি না। এই মৃত্যু অবশ্যই অপরিহার্য নয়। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন পথ নির্মাণ না হলে মানুষ চোরাকারবারি ও পাচারকারীদের হাতেই পড়বে, যারা তাদের জীবনকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়।
আইওএম‑এর সংখ্যাগুলো প্রতিফলিত করে যে সমুদ্রপথ, বিশেষত ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিক রুট, এখনও অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ রুট। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগরের উপর এই বিপজ্জনক রুটে হাজারেরও বেশি মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। অনেক যাত্রী অস্বাস্থ্যকর নৌকায় দীর্ঘ সময় ধরে ভেসে থাকার পর ডুবে গেছে, আবার অনেকের মরদেহও সমুদ্রজলে মিলিত হয়নি।
এছাড়া, আটলান্টিক রুটে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপগুলোর দিকে যাত্রার সময়ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিবেচিত হয়েছে। এই দূরপথে আবেদনকারীরাও দারিদ্র্য, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অপরাধী চক্রের চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
আইওএম‑এর বিশ্লেষণে লক্ষ্য করা গেছে যে নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাব, কঠোর সীমান্ত নীতি, এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন‑প্রতিরোধ ব্যবস্থা অভিবাসীদের জন্য বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন আইনত নিরাপদ বিকল্প কম থাকে, তখন মানুষ স্মাগলিং এবং পাচারকারীদের সহায়তায় জীবন বাজি রেখে যাত্রা করে, ফলে প্রাণহানির সুযোগ আরও বেড়ে যায়।
নীতিনির্ধারকরা মনে করেন যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিরাপদ অভিবাসনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না হলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আইওএম‑এর মতে, শুধু সহায়তা সংস্থা নয়, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও সহযোগিতা, নিরাপদ পথ নির্মাণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ করতে হবে।
যদিও ২০২৫ সালে সংখ্যাটি কিছুটা কমেছে (৭ হাজার ৬৬৭ জন), কিন্তু ২০২৪ সালে রেকর্ড করা ৯ হাজার ২০০ জন মৃত্যুর তুলনায় এই সূচক একটি তামাশার মতো হলেও বাস্তবে তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এর প্রভাব থাকার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি ব্যতিক্রম হতে পারে।
এই ধরণের তথ্যসমূহের পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা, অনেক অঞ্চলে সরকার বা সহায়ক সংস্থা পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধানে সক্ষম নয়, কিছু জটিল পরিবেশে মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা অপস্থিত তথ্যের কারণে সঠিকভাবে ধরা পড়ে না।
আইওএম‑এর এসব তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক প্রতিক্রিয়া দৃঢ় করার আহ্বান বেড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোকে নিরাপদ অভিবাসন পথ নির্মাণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে আরো সম্পদ বিনিয়োগ এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এমন একটি পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২১ জনের মতো অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হচ্ছে, বিশ্ব সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে এই মানবিক সংকটকে সাধারণ আরেকটি সংখ্যা মনে না করে প্রতিটি মানুষের পেছনের বাস্তব কষ্ট ও পরিবারগুলোর দুর্দশাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার। আইওএম‑এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে নিরাপদ ও মানবিক অভিবাসন নীতির অভাবে এই বিপজ্জনক যাত্রাপথগুলো চলছে, এবং এটি একটি সামগ্রিক মানবিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ যা এখনো সমাধান হয়নি।


