ইতালির আব্রুজ্জো অঞ্চলের মাউন্ট গিরিফালকোর পাদদেশে অবস্থিত এক প্রাচীন গ্রাম পালিয়ারা দেই মার্সি। এখানে মানুষের চেয়ে বিড়ালের সংখ্যা অনেক বেশি। সরু গলি দিয়ে বিড়ালেরা হেঁটে বেড়ায়, ঘরে অবাধে আসা-যাওয়া করে এবং পাহাড়ের দিকে মুখ করা দেয়ালের উপর শুয়ে রোদ পোহায়। কয়েক দশকের জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে গ্রামটিতে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
তবে গত মার্চ মাস থেকে চিত্রটা কিছুটা বদলেছে। গ্রামটিতে এক বিরল ঘটনা ঘটেছে, একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। তার নাম রাখা হয়েছে লারা বুসি ত্রাবুকো। গত প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে পালিয়ারা দেই মার্সিতে জন্মানো প্রথম শিশু সে। তার আগমনে গ্রামটির জনসংখ্যা এখন ২০।
লারার ঘরের ঠিক উল্টো দিকের গির্জায় তার খ্রিষ্টধর্মীয় নামকরণ বা ‘ক্রিস্টেনিং’ অনুষ্ঠানে পুরো গ্রামের লোকজন এসেছিল। এমনকি বিড়ালগুলোও সেখানে হাজির ছিল। গ্রামটিতে একটি শিশুর উপস্থিতি এতটাই নতুন ঘটনা যে, লারা এখন সেখানকার পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। তার মা সিনজিয়া ত্রাবুকো জানিয়েছেন, যারা পালিয়ারা দেই মার্সির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না, তারাও লারার কথা শুনে এখানে আসছে। মাত্র নয় মাস বয়সেই সে বিখ্যাত হয়ে গেছে।
লারার আগমন যেমন নতুন এক আশার গল্প, তেমনি এটি ইতালির ভয়াবহ জনসংখ্যা সংকটের কঠিন চিত্র। স্থানীয় মেয়র জিউসেপ্পিনা পেরোজি জানিয়েছেন, পালিয়ারা দেই মার্সি ভয়াবহ জনশূন্যতায় ভুগছে। অনেক বৃদ্ধ মানুষ এখন আর নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্ম আসেনি। লারার বাবা-মা পাওলো বুসি এবং সিনজিয়া ত্রাবুকোর বয়স যথাক্রমে ৫৬ এবং ৪২। সংগীত শিক্ষক সিনজিয়া রোমের কাছে ফ্রাসকাটিতে বড় হয়েছেন। শহরের কোলাহল ছেড়ে নিরিবিলি পরিবেশে পরিবার গড়ার ইচ্ছায় তিনি তার দাদার গ্রামে চলে আসেন। সেখানে নির্মাণ শ্রমিক পাওলোর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা দুজন এখানে পরিবার শুরু করায় পেরোজি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ইতালির পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ইতালিতে জন্মহার সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, মাত্র ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৪ জনে। এটি গত ১৬ বছরের নেতিবাচক ধারারই প্রতিফলন। প্রজনন হারও রেকর্ড হ্রাস পেয়ে নারী প্রতি গড়ে মাত্র ১.১৮-এ দাঁড়িয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অন্যতম সবচেয়ে কম।
জনসংখ্যার এই পতনের পেছনের কারণগুলো হলো, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং তরুণদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগ। কর্মজীবী মায়েদের জন্য দেশটিতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। পুরুষদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব বাড়ছে। অনেকেই সচেতনভাবে সন্তান নিতে চাইছেন না।
২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ইতালির জন্মহার আরও কমছে। ইতালির ২০টি অঞ্চলের মধ্যে আব্রুজ্জোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, যেখানে ২০২৪ সালের তুলনায় জন্মহার ১০.২ শতাংশ কমে গেছে।
বর্তমান সরকার ইতালিকে ‘ডেমোগ্রাফিক উইন্টার’ বা জনসংখ্যা সংকট থেকে বাঁচাতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতিটি শিশুর জন্মের জন্য ১ হাজার ইউরো ‘বেবি বোনাস’ এবং মাসে ৩৭০ ইউরো শিশু ভাতা দিচ্ছে। লারার পরিবার এই সুবিধা পেলেও তাদের মূল সংগ্রাম হলো কর্মস্থলের পাশাপাশি শিশুর দেখাশোনা করা। ইতালির শিশু যত্ন বা ‘চাইল্ডকেয়ার’ ব্যবস্থা মোটেই ভালো নয়। তাই অনেক নারীকে সন্তান নেওয়ার পর কাজ ছেড়ে দিতে হয়।
পালিয়ারা দেই মার্সি থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত সুলমোনা শহর। সেখানে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় ‘অ্যানুনজিয়াটা’ হাসপাতালের মাতৃত্বকালীন ইউনিটটি বন্ধের উপক্রম হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বছরে অন্তত ৫০০টি প্রসব না হলে এই ইউনিটের তহবিল বন্ধ হয়ে যায়, অথচ ২০২৪ সালে এখানে মাত্র ১২০টি শিশুর জন্ম হয়েছে।
ইউনিটটি বন্ধ হয়ে গেলে গর্ভবতী নারীদের এক ঘণ্টা দূরের শহর এল-আকুইলাতে যেতে হবে। শীতকালে বরফের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হবে। স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ জিয়ানলুকা দি লুইগি এবং মিডওয়াইফ বার্টা গাম্বিনা এই ইউনিটটি টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। তাদের মতে, ৫০০ জন্মের পুরনো নিয়ম এখন অবাস্তব। শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, বন্ধ্যাত্ব দূর করা এবং ডিম্বাণু সংরক্ষণের মতো আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে ইতালির রক্ষণশীল মনোভাব বদলানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন দেশটির চিকিৎসকরা।


