ভুয়া অসুস্থতা বা কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অপব্যবহার রোধে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে ইতালি। দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা-আইএনপিএস জানিয়েছে, কর্মীদের বাসায় পরিদর্শন বা ‘ভিসিট ফিসকালি’ ৩.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি, উভয় খাতের কর্মীদের অসুস্থতাকালীন নির্দিষ্ট সময় বাসায় উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া পরিদর্শনের সময় বাসায় অনুপস্থিত পাওয়া গেলে অসুস্থতা ভাতা বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অসুস্থতার ছুটিতে থাকা কর্মীদের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নিজ বাসায় অবস্থান করতে হবে। এই সময়সীমার মধ্যে ‘আইএনপিএ’-এর মেডিক্যাল ইন্সপেক্টর বা অনুমোদিত চিকিৎসক হঠাৎ করে বাসায় গিয়ে কর্মীর শারীরিক অবস্থা যাচাই করতে পারেন। লক্ষ্য হলো, যারা প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ, তারা যেন ভাতা পান, আর যারা ভুয়া সার্টিফিকেটের আশ্রয়ে ছুটি নিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
‘আইএনপিএ’ সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসুস্থতার ছুটি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বেড়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ছুটি বা ধারাবাহিক ছুটির ক্ষেত্রে সন্দেহজনক প্রবণতা দেখা যায়। পরিদর্শন ৩.৭ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ডেটা-ভিত্তিক নজরদারি, কোন খাতে, কোন অঞ্চলে এবং কোন সময় অসুস্থতার ছুটি বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে।
ইতালিতে অসুস্থতার ছুটি ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কর্মী অসুস্থ হলে চিকিৎসক ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ইস্যু করেন, যা সরাসরি ‘আইএনপিএ’ ডাটাবেজে আপলোড হয়। এরপর প্রয়োজন মনে করলে সংস্থা ‘ভিসিট ফিসকালি’ পাঠায়। পরিদর্শনের সময় কর্মী বাসায় না থাকলে বা অসুস্থতার দাবি অসঙ্গত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ভাতা স্থগিত বা বাতিল করা যেতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, যেমন সতর্কবার্তা, বেতন কাটা বা চাকরিচ্যুতি, গ্রহণ করতে পারেন।
তবে আইন অনুযায়ী, কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণকে বৈধ ধরা হয়। যেমন, জরুরি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাওয়া, নির্ধারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বা চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এসব ক্ষেত্রে কর্মীকে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। ‘আইএনপিএ’ স্পষ্ট করেছে, উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং অপব্যবহার কমিয়ে সিস্টেমের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এ পদক্ষেপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। একদিকে তারা স্বীকার করছে যে ভুয়া অসুস্থতা সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সৎ কর্মীদের জন্যও অসুবিধা তৈরি করে। অন্যদিকে তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত নজরদারি কর্মীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী বা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতার ক্ষেত্রে বাসায় বাধ্যতামূলক উপস্থিতির সময়সীমা কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে তারা মত দিয়েছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই নীতির ফলে সরকারি খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের অপচয় কমবে। অসুস্থতা ভাতা ইতালির কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এটি কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু যদি অনিয়ম বাড়ে, তবে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই কঠোর নজরদারি অপরিহার্য বলে তারা মনে করেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির মতো উচ্চ সামাজিক ব্যয়সম্পন্ন দেশে ভাতা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভুয়া ছুটি কমলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, করদাতাদের অর্থ সাশ্রয় হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা করতে সুবিধা পাবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতে কর্মী অনুপস্থিতি ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতায় বড় প্রভাব ফেলে।
এদিকে কর্মীদের জন্য পরামর্শ হলো, অসুস্থতার ছুটি নেওয়ার সময় ঠিকানা, ফোন নম্বর ও সম্ভাব্য চিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্য হালনাগাদ রাখা। নির্ধারিত সময়সীমায় বাসায় অবস্থান নিশ্চিত করা এবং জরুরি প্রয়োজনে বের হলে যথাযথ প্রমাণ সংরক্ষণ করা। কারণ পরিদর্শনে অনুপস্থিতি ধরা পড়লে প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার ভাতা স্থগিত, এবং পুনরাবৃত্তিতে আরও কঠোর শাস্তি হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ‘আইএনপিএ’-এর এই উদ্যোগ ইতালির সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা। একদিকে এটি ভুয়া অসুস্থতা বা ‘অ্যাবসেন্টিজম’ কমাতে সহায়ক হতে পারে; অন্যদিকে কর্মীদের অধিকার ও গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নও সামনে আনছে। আগামী মাসগুলোতে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বোঝা যাবে, ৩.৭ শতাংশ পরিদর্শন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়েছে এবং এটি কর্মসংস্কৃতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে।


