ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলের ছোট শহর পালমা কাম্পানিয়া এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শহরটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্দেশে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক লিফলেট বিতরণকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা। স্বাস্থ্য সচেতনতার নামে একটি নির্দিষ্ট কমিউনিটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে কি না, এই প্রশ্নে সরগরম স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রবাসী মহল।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিতরণ করা লিফলেটে নিয়মিত গোসল, দাঁত মাজা, নখ কাটা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং ঘরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে লিফলেটটি মূলত বাংলাদেশি অভিবাসীদের লক্ষ্য করে তৈরি হওয়ায় অনেকেই এটিকে অপমানজনক ও বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বড় অংশের অভিযোগ, এ ধরনের নির্দেশনা সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়, বরং আমাদের আলাদা করে ‘অপরিচ্ছন্ন’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
অন্যদিকে পালমা কাম্পানিয়ার মেয়র ও স্থানীয় প্রশাসন অভিযোগটি সরাসরি নাকচ করেছে। তাদের দাবি, এটি কোনোভাবেই বর্ণবাদী উদ্যোগ নয়। বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নেওয়া একটি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি শহরটিতে কয়েকজন যক্ষ্মা (টিবি) রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি কিছু এলাকায় ছোট ফ্ল্যাটে অতিরিক্ত মানুষের বসবাস স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, যেখানে ঝুঁকি বেশি, সেখানেই সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়। এটিকে বৈষম্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পালমা কাম্পানিয়া শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশি। দীর্ঘদিন ধরে তারা কৃষি, নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও ছোট ব্যবসা খাতে কাজ করে শহরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। এই বড় উপস্থিতির কারণেই লিফলেট বিতরণের বিষয়টি দ্রুত একটি জাতিগত ও সামাজিক ইস্যুতে রূপ নেয়। প্রবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এমন উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে ভুল বার্তা দিতে পারে এবং বাংলাদেশিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার করতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতরেও একক মত নেই। কিছু কমিউনিটি নেতা মনে করছেন, সমস্যাগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করাও সমাধান নয়। একজন কমিউনিটি প্রতিনিধি বলেন, আমাদের অনেকেই অল্প জায়গায় বেশি মানুষ নিয়ে থাকি। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, এটা সত্য। সম্মান বজায় রেখে সচেতনতা বাড়ানো গেলে সেটি খারাপ নয়। তাদের মতে, প্রশ্নটা লিফলেটের ভাষা ও লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা নয়।
পালমা কাম্পানিয়ার এই বিতর্ক আবারও দেখিয়ে দিল, ইতালিতে প্রবাসী জীবনে সম্মান, জনস্বাস্থ্য ও সহাবস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা কঠিন। একদিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা, এই দুইয়ের মাঝখানে সূক্ষ্ম সীমারেখা টানতে না পারলে এমন উদ্যোগ উল্টো বিভাজন বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ নিতে হলে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও কমিউনিটি প্রতিনিধিদের একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক পথ।


