ইউরোপের মধ্যে অভিবাসন ও কর্মসংস্থান‑ভিত্তিক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের আগ্রহ অনেক বছর ধরেই খুব বেশি। ইতালি বিশেষ করে ফ্লুসি ডিক্রি-এর আওতায় বাংলাদেশিদের ঋতুকালীন ও অ-ঋতুকালীন কাজের সুযোগ দিচ্ছে, যা ২০২২ সালে পুনরায় শুরু হওয়ার পর আবেদনকারীদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গেছে। তবে এই প্রসেসে জালিয়াতি, দালালচক্র ও অনিয়মিত ভিসা কেলেঙ্কারির কারণে বহু মানুষ বিপাকে পড়েছে এবং ইতালির কর্তৃপক্ষও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
রোমের আদালত সম্প্রতি এক বড় ভিসা জালিয়াতি মামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গুরুতর দোষী সাব্যস্ত করে দীর্ঘ কারাদণ্ড ঘোষণা করেছে, যেখানে তারা ভিসা ও কাজের অনুমতি পেতে জাল নথি, প্রতারণামূলক চুক্তি ও দালাল ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ আদায় করছিল। এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতারণা কেবল ব্যক্তিগত উপার্জনের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অনেক সময় ভিসা পেয়েও কর্মসংস্থান বা আইনগত স্থিতি পাওয়া যায়নি।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভিসা কেলেঙ্কারির পিছনে যে বড় কারণগুলোর মুখ দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, ভুয়া কাজের অনুমতি, ভুয়া চাকরির পত্র, এবং ভিসা আবেদন ব্যবস্থায় অনিয়ম। ইতালি দূতাবাস ও ফ্লুসি ডিক্রি‑র আওতায় থাকা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়া যাচাই করার সময় বহু ক্ষেত্রে জাল নথি ধরা পড়ে, যার কারণে ইতালির পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান ছাড়াই ভিসা পাওয়া বা অর্থ দিয়ে সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে চিহ্নিত হয়েছে।
ইতালির অর্থ ও আর্থিক পুলিশ এবং রোমের ঊর্ধ্বতন তদন্ত সংস্থা এই ধরনের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত চালিয়েছে। তারা অভিবাসীদের কাছ থেকে অনেক সময় অত্যধিক অর্থ নেওয়া, ভুয়া চুক্তিপত্র তৈরি, এবং অনিয়মিত মধ্যস্থকারীদের মাধ্যমে ভিসা সুরক্ষার মতো অভিযোগগুলোর তথ্য সংগ্রহ করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় রয়েছে এমন অভিযোগও যে ভিসা অনুমোদনের জন্য জাল নথি বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যা ইতালির অভিবাসন বিধি ও আইন ভঙ্গ করে।
এই ঘটনাগুলো ইতালির অভিবাসন নীতির উপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব ফেলছে। ইতালির দূতাবাস বাংলাদেশে নিজ নিজ ভিসা আবেদন কেন্দ্রে সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, শুধু সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়া ও নির্ধারিত ফি অনুযায়ী আবেদন করা উচিত, কোনো মধ্যস্থকার বা দালালের কাছে টাকা দিলে তা ভিসা বাতিল বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কারণ হতে পারে।
এদিকে, ভিসা জালিয়াতির মতো পরিস্থিতির কারণে ইতালির দূতাবাস কিছু পরিবর্তিত নীতি ও প্রক্রিয়া অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের একটি ঘোষণায় দূতাবাস বলেছে যে ভিসা আবেদনকারীকে প্রথমে প্রাথমিক নথি যাচাইয়ের পরে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে, এবং যদি কোনো সন্দেহ থাকলে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।
এই সব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ইতালির সরকারের মধ্যে অভিবাসন ও মাইগ্রেশন বিষয়ে আলোচনা ও সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। দুই দেশ মিলেমিশে নথিপত্র যাচাই, ভিসা প্রসেসিং এবং গুণগত অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে যাতে সত্যিকার কর্মী ও অভিবাসীরা বৈধ সুযোগ পেতে পারে এবং প্রতারণামূলক চক্রগুলোকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করা যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই রায় শুধুমাত্র বিচারের রায় নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা যে অনিয়মিত প্রক্রিয়া ও ভিসা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে এবং যারা এতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে। এতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে আইনি, স্বচ্ছ ও নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে উঠছে।


