ইতালির মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ল’আকুইলা হঠাৎ করেই অভিবাসীদের নতুন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে অভিবাসী আগমন ছিল নগণ্য, সেখানে এখন প্রতিদিন ভোরে শহরের সরকারি প্রশাসনিক দপ্তর (প্রিফেকচার)-এর সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকছেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ অভিবাসীরা।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে টিকটকের ভিডিও, ভয়েস নোট এবং অভিবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন নির্দেশনা।
শহর তখনো ঘুমিয়ে, দোকানপাট বন্ধ। সেই সময়েই সরকারি ভবনের সামনেই পৌঁছে যান বহু তরুণ অভিবাসী।
কারো হাতে ছোট ব্যাগ, কেউ আবার কেবল মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে। এতে তাদের পথপ্রদর্শক হচ্ছে, টিকটক ভিডিও, স্ক্রিনশট, এবং আগে যাওয়া অভিবাসীদের পাঠানো ভয়েস নোট।

কোনো সরকারি নির্দেশনা নয়, কোনো অভিবাসন সহায়তা সংস্থার গাইড নয়, শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক আর মুখে-মুখে প্রচারই তাদের এখানে নিয়ে এসেছে ।
শহরের বাসিন্দারা জানান, অভিবাসীরা রাত কাটায় বাসস্ট্যান্ড, পার্ক বা যেকোনো খোলা স্থানে, এরপর ভোরে সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধি দপ্তরের সামনে লাইন ধরে দাঁড়ায়, যেন কেউ এসে নাম ধরে ডাকবে।
একটি নতুন রুটের উদ্ভব
ল’আকুইলায় পৌঁছানো ১৯ বছর বয়সী আফগান ছাত্র মাঘদি বলেন…
আমি বাস ও ট্রেনে করে এসেছি। পুরো পথটাই বন্ধুদের পাঠানো ভয়েস নোট আর অনলাইনে পাওয়া নির্দেশনা দেখে এসেছি।
তার ফোনে দেখা যায় আত্মীয়দের পাঠানো ছোট ছোট অর্থসহায়তার স্ক্রিনশট, যা তাকে যাত্রাপথে টিকিয়ে রেখেছে।
অভিবাসীদের বড় অংশই বালকান রুট ধরে হাঁটা, বাস, ট্রেন সব মিলিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। তাদের প্রায় সবাই আন্তর্জাতিক সুরক্ষার (অ্যাসাইলাম) আবেদন করতে চায়।
আরেক তরুণ বলেন…
কেউ আমাদের এখানে নিয়ে আসেনি। শুধু বলা হয়েছিল, ল’আকুইলা উপকারী জায়গা।
একটি পশতু টিকটক ভিডিওতে দেখা যায়, এক ইনফ্লুয়েন্সার ইতালিতে ডকুমেন্ট পাওয়া, রেসিডেন্সি পারমিট ও অন্যান্য সুবিধার ব্যাখ্যার পাশাপাশি ল’আকুইলার নাম উল্লেখ করছেন। মন্তব্যে অনেকে কোথায় যাবে, কি করতে হবে এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা চাইছেন।
ইতালির বড় শহরগুলোতে অভিবাসী প্রক্রিয়াকরণ ধীর হওয়ায় অনেক তরুণ ছোট শহরকে নিরাপদ ও দ্রুত প্রক্রিয়া পাওয়ার জায়গা হিসেবে দেখছে। স্থানীয়দের মতে, ল’আকুইলায় আগমন কম হওয়ায় আগে অল্পসংখ্যক মানুষ তুলনামূলক দ্রুত নিবন্ধন সেবা পেয়েছিল, ফলে সেই অভিজ্ঞতা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, এবং এতে নতুন তরুণদের কাছে শহরটি সহজ-প্রবেশযোগ্য গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পায়।
এভাবেই অনলাইনভিত্তিক তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে একটি নতুন অভিবাসন রুট গড়ে উঠতে থাকে।
রাজনৈতিক বিতর্ক
যেখানে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক পরামর্শই তরুণদের শহরটিতে টেনে আনছে। সেখানে শহরের মেয়র পিয়েরলুইজি বিয়ন্দি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন…
এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আগমন নয়। মানবপাচারকারীরাই অভিবাসীদের সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধি দপ্তর (প্রিফেকচার)-এ পাঠাচ্ছে, তারা মানুষকে যেন বস্তু হিসেবে ব্যবহার করছে।
তাঁর মন্তব্যে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, এ ধরনের মন্তব্য তরুণ অভিবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে, এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
২০০৯ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ল’আকুইলা ছিল ইতালির সবচেয়ে আলোচিত শহরগুলোর একটি।
আজ আবার ভিন্ন কারণে, সামাজিক মাধ্যম-চালিত অভিবাসী ঢলের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।


