এক দশক আগেও যে দেশটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে সফল এবং অনুগত সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হতো, সেই পোল্যান্ডের আকাশে এখন ‘পোলক্সিট’-এর কালো মেঘ জমছে। ব্রেক্সিটের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ইউরোপের কেন্দ্রে থাকা পোল্যান্ডের ইইউ ত্যাগের এই ক্রমবর্ধমান গুঞ্জন এখন আর কেবল চায়ের কাপের আড্ডা নয়, বরং ব্রাসেলসের নীতি-নির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
জনমতের নাটকীয় ধস ও পরিসংখ্যানে নতুন ইঙ্গিত
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক জরিপগুলো পোলিশ রাজনীতিতে একটি বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক সময় দেশটিতে ইইউ সদস্যপদের পক্ষে সমর্থন ছিল আকাশচুম্বী ৯২ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই সেই চিত্র বদলে গেছে, সদস্যপদে থাকার পক্ষে সমর্থন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশে। প্রথমবারের মতো প্রায় ২৫ শতাংশ (এক-চতুর্থাংশ) পোলিশ নাগরিক সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (পোলক্সিট) পক্ষে মত দিয়েছেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ইইউ-বিরোধী মনোভাব দ্রুত বাড়ছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যে কারণে বিচ্ছেদ সুর
পোল্যান্ডের এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান সংকট কাজ করছে, প্রথমত পোল্যান্ডের ডানপন্থী দলগুলো এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরস্কির দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি অর্থনৈতিক জোট থেকে ক্রমে একটি “সুপার-স্টেট” বা অতি-রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। পোল্যান্ডের নিজস্ব বিচার বিভাগ এবং আইনি কাঠামোতে ইইউ-এর হস্তক্ষেপকে তারা পোলিশ সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছে।
দ্বিতীয়ত, ইইউ-এর প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক অভিবাসন কোটা পোল্যান্ডের জন্য একটি সংবেদনশীল ইস্যু। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তিতে অভিবাসী গ্রহণ না করলে বিপুল অংকের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পোল্যান্ডের সাধারণ মানুষের ধারণা, এটি তাদের সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
তুতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশবাদী নীতি বা ‘গ্রিন ডিল’ পোল্যান্ডের মধ্যবিত্ত ও কৃষকদের পকেটে টান দিচ্ছে। কয়লা-নির্ভর পোলিশ শিল্প এবং কৃষি খাতে ইইউ-এর কঠোর বিধিনিষেধের ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ব্রাসেলস সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ
পোল্যান্ড এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক, যিনি একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ এবং কট্টর ইইউ-পন্থী। তিনি ইইউ-এর সাথে সম্পর্ক মেরামতের মাধ্যমে পোল্যান্ডকে মূলধারায় টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন। অন্য পক্ষে রয়েছে সাবেক শাসক দল ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস) এবং অতি-ডানপন্থী দল কনফেডারেশন। তারা সুকৌশলে জনগণের মনে ‘পোলক্সিট’ বা অন্ততপক্ষে ইইউ-এর ভেতরে থেকেও নিজেদের ইচ্ছেমতো চলার একটি আকাঙ্ক্ষা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে, পোল্যান্ড কেবল ইউরোপের অংশ হতে চায়, ব্রাসেলসের কলোনি নয়।
ডিজিটাল অপপ্রচার ও আধুনিক যুদ্ধ
২০২৬ সালের এই বিতর্ককে উসকে দিচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। পোলিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিপ-ফেক ভিডিও ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোলক্সিট-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে, ইইউ ত্যাগ করলেই পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও বাস্তবতা
পোল্যান্ড ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে তাদের অর্থনীতিতে। পোল্যান্ড এখনো ইইউ-এর উন্নয়ন তহবিলের অন্যতম বড় গ্রহীতা। বিশ্লেষকদের মতে, পোলক্সিট কার্যকর হলে, দেশটির জিডিপি রাতারাতি ৫-৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন এবং ইউক্রেন সীমান্তে থাকা পোল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
শেষ কথা
পোল্যান্ড কি ব্রিটেনের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পথে হাঁটবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক দর কষাকষির একটি কৌশল, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ২০২৬ সালের এই বিতর্ক একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখন আর পোলিশরা “নিঃশর্ত আশীর্বাদ” হিসেবে দেখছে না। ২০২৭ সালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনই হতে পারে পোলক্সিট নাটকের চূড়ান্ত অঙ্ক।


