সাম্প্রতিক লিসবন থেকে ভেনিসের উদ্দেশে যাত্রা করা পর্তুগালের জাতীয় বিমান সংস্থা (TAP)-এর একটি বিমান উড্ডয়নের কিছু পরেই বজ্রপাতের শিকার হয়। বিমানে বৈদ্যুতিক স্রোত প্রবাহিত হওয়ার পর, যা সাধারণত আধুনিক বিমানের জন্য ক্ষতিকর নয় একটি ইঞ্জিনের শক্তি কমে যায় এবং ফ্লাইটের কম্পিউটার সিস্টেম পাইলটদের ইঞ্জিনে ত্রুটির সংকেত দেয়।
ফলে এয়ারবাস-এ৩২০ মডেলের বিমানটি পোন্তে দে সোর এলাকার আকাশে থাকা অবস্থায় লিসবনে ফিরে আসে। টিপি-৮৬২ ফ্লাইটটি লিসবনের হুম্বার্তো দেলগাদো বিমানবন্দর থেকে ১৩:৩৬-এ উড্ডয়ন করেছিল। সে সময় ক্লাউদিয়া নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টি ও বজ্রঝড় চলছিল। বজ্রপাতে আক্রান্ত বিমানটি এখন মাটিতে রয়েছে এবং পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলবে।

মাটিতে ইট-সুরকির ঘরের ভেতর থাকলেও বজ্রপাত ভয় ধরিয়ে দেয়। তাই আকাশে হাজার ফুট ওপরে ইলেকট্রনিক সিস্টেম ও জ্বালানিভর্তি একটি বিমানে বজ্রপাতের ধারণা আরও ভয়াবহ মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি ঘটেই থাকে অনেক বেশি নিয়মিতভাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজগুলো গড়ে বছরে অন্তত একবার বজ্রপাতের শিকার হয়, তবুও বড় কোনো ক্ষতি হয় না। এ তথ্য দিয়েছে ম্যাসাচুসেটসের বজ্রপাত প্রযুক্তি সংস্থা, যারা সামরিক ও বেসামরিক বিমানের বজ্রপাত সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাত-সৃষ্ট শেষ বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৭ সালে, যখন বজ্রপাতের কারণে জ্বালানির ট্যাংকে বিস্ফোরণ হয়। এর পর থেকে বিমান শিল্পে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।
সিএনএন–এর আবহাওয়াবিদ রব মার্সিয়ানো বলেন,গত কয়েক দশকে বিমান চলাচলে বজ্রপাত সামলানোর প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। বড় বিমানগুলো ঝড় এড়িয়ে যায়, কিন্তু কখনও কখনও ঝড়ের মধ্য দিয়েও যেতে হয় আর সে ব্যাপারে তারা যথেষ্ট প্রস্তুত।
বিমানকে যখন বজ্রপাত আঘাত করে তখন কী ঘটে
বিমানের সুরক্ষা সম্পর্কে সিএনএন–কে বিস্তারিত জানান উড়োজাহাজ নিরাপত্তা ফাউন্ডেশন–এর সভাপতি উইলিয়াম ভস।
সিএনএন – উইলিয়াম ভস
সিএনএন: বজ্রপাত বিমানকে কতটা প্রভাবিত করে?
ভস: বহু বছর ধরেই বিমানকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন তারা নিরাপদে বজ্রপাত সহ্য করতে পারে। ১৯৩০-এর দশকেই জানা ছিল যে বিমান বজ্রপাতের মুখোমুখি হবে, তাই নকশায় সেই সুরক্ষা রাখা হয়েছে।
বজ্রপাতের চার্জ বিমান ঘুরে যেন বাহিরে বের হয়ে যেতে পারে, সেজন্য স্ট্যাটিক ডিসচার্জ উইকসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকে।
সাধারণত জ্বালানি জ্বলে ওঠে না, বিমান ভেঙে যায় না এবং কোনো ক্ষতি হয় না। অনেক সময় বজ্রপাত বের হওয়ার স্থানে ছোট একটি ছিদ্র হয়, এটাই মূল ক্ষতি।
সিএনএন: বজ্রপাত কি এখনো বিমান ভূপাতিত করতে পারে?
ভস: না সেটা অসম্ভব। বলা যায়, এটি এখন ঝুঁকির তালিকার অনেক নিচে। প্রতিদিনই অসংখ্য বিমান বজ্রপাতের শিকার হয়, তবুও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না।
সিএনএন: বজ্রপাত হলে কী ধরনের ক্ষতি দেখা যেতে পারে?
ভস: সাধারণত ডানার আগা বা লেজের ধারালো জায়গাগুলোতে ক্ষতি হয়। বেশিরভাগ সময় ছোট একটি কয়েনের মতো ছিদ্র, মুষ্টির সমান বড় হলে সেটাকে বড় ক্ষতি বলা হবে।

সিএনএন: ইলেকট্রনিকস কি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
ভস: সাধারণত না। বিমানের ইলেকট্রনিকস এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন স্থির বৈদ্যুতিক চার্জের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে। এমনকি বজ্রপাত ছাড়া সাধারণ যাত্রাতেও স্ট্যাটিক চার্জ জমে, তাই সিস্টেমগুলো শক্তিশালী।
সিএনএন: জ্বালানির ট্যাংক কি ঝুঁকিতে থাকে?
ভস: না। সেখানে বিশেষভাবে স্থির বৈদ্যুতিক স্রোত নির্গমন এবং গ্রাউন্ডিংয়ের ব্যবস্থা থাকে।
সিএনএন: তাহলে কি বিমানগুলো খুব কঠোর পরীক্ষা পাস করে?
ভস: অবশ্যই। বজ্রপাত নতুন কোনো ঝুঁকি নয়। গত ৫০–৬০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে গবেষণা করে বিমানকে সর্বোচ্চ নিরাপদ করে তুলেছেন।
সিএনএন: বিমানে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত হলে যাত্রী কী অনুভব করবেন?
ভস: বেশিরভাগ সময় কিছুই না। তবে হয়তো একটি উজ্জ্বল ঝলক দেখা যাবে।
সিএনএন: কোনো ধাক্কা বা নড়াচড়া অনুভূত হবে না?
ভস: খুব সম্ভবত না। কারণ বিদ্যুৎ বাহিরের অংশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঠিক যেমন গাড়ির মধ্যে বসে থাকলে গাড়িতে বজ্রপাত হলেও অনেক সময় বোঝাই যায় না।


