ইউরোপের বাইরে আশ্রয়প্রার্থী ও প্রত্যাখ্যাত অভিবাসীদের রাখার জন্য “রিটার্ন হাব” বা বহিরাগত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগে ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। স্পেন এ ধরনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে জানিয়েছে, এতে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও আশ্রয় ব্যবস্থার মৌলিক নীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর কয়েকটি সদস্য দেশ, বিশেষ করে গ্রিস, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া ও ডেনমার্ক। তাদের লক্ষ্য আফ্রিকার কোনো দেশে কেন্দ্র স্থাপন করে বাতিল আশ্রয়প্রার্থীদের সেখানে রেখে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।
স্পেনের অভিবাসন নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ইউরোপের বাইরে আশ্রয় প্রক্রিয়া চালু করা হলে দায়িত্ব স্থানান্তর হবে, অর্থাৎ ইউরোপ নিজের দায়িত্ব অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেবে। স্পেনের মতে প্রধান সমস্যা তিনটি। প্রথমটি হল, আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন ইউরোপীয় ভূখণ্ডে নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এটি পাশ কাটাতে বাইরে ক্যাম্প করলে আইনি জটিলতা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত আফ্রিকার সম্ভাব্য দেশগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষা ইউরোপের মানদণ্ডে থাকবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তৃতীয়ত অভিবাসীরা কতদিন সেখানে থাকবে, কে দায় নেবে, তা স্পষ্ট নয়। এতে “ডি-ফ্যাক্টো ডিটেনশন ক্যাম্প” তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছে মাদ্রিদ।
রিটার্ন হাব পরিকল্পনা ইউরোপকে মূলত দুই শিবিরে ভাগ করেছে। কঠোর নীতির পক্ষেগ্রিস, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, তারা চায় দ্রুত প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ। আর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে স্পেনসহ কয়েকটি দক্ষিণ ইউরোপীয় রাষ্ট্র।যাদের মানবাধিকার ও আইনি কাঠামো অগ্রাধিকার
স্পেন নিজেও বড় অভিবাসন রুটের দেশ। আফ্রিকা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ হয়ে বহু মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করে। তাদের আশঙ্কা যদি বাইরে ক্যাম্প তৈরি হয়, তাহলে ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই মানুষ অনিরাপদ দেশে আটকে যাবে, কিন্তু বাস্তবে অভিবাসন কমবেও না; বরং মানবিক সংকট নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট যে নতুন অভিবাসন কাঠামো অনুমোদন করেছে তাতে দ্রুত যাচাই, নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠানো এবং সীমান্ত প্রক্রিয়া জোরদারের কথা বলা হয়েছে। রিটার্ন হাবকে অনেক দেশ এই আইনের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখছে, কিন্তু স্পেন বলছে, আইন থাকলেও তা মানবাধিকার সুরক্ষার সীমা অতিক্রম করতে পারে না।
এই বিরোধিতা ইউরোপীয় ঐক্যে চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, অভিবাসন নীতি ইইউর যৌথ নীতি কিন্তু বাস্তবায়ন জাতীয় সরকারের হাতে, ফলে সম্মতি ছাড়া প্রকল্প কার্যকর কঠিন।বিশেষজ্ঞদের মতে, সব সদস্য দেশের রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বহিরাগত ক্যাম্প বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে, সীমিত আকারে পরীক্ষামূলক কেন্দ্র, নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও বিরোধিতায় পরিকল্পনা স্থগিত।
ইউরোপে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি আইনি ও নৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। স্পেনের বিরোধিতা দেখাচ্ছে, ইউরোপ কঠোর নীতি নিতে চাইলেও সব দেশ একই পথে হাঁটতে রাজি নয়। ফলে রিটার্ন হাব প্রকল্প ইউরোপের ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।


