বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হানছে ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থায়, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য-এর ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নিপীড়নের আশঙ্কা দেখিয়ে আশ্রয় চাওয়া কয়েক হাজার বাংলাদেশি এখন নজিরবিহীন আইনি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আশ্রয়ের ভিত্তি নতুন করে যাচাই শুরু করেছে। যে যুক্তিতে এতদিন আশ্রয় মিলেছিল, সেই যুক্তিই এখন অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মূল নীতি হলো, নিজ দেশে রাজনৈতিক কারণে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য নিপীড়নের আশঙ্কা থাকতে হবে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেলে আইনও বদলে যায়। অভিবাসন নীতিমালায় রয়েছে, যদি প্রমাণিত হয় যে আবেদনকারীর নিজ দেশের পরিস্থিতিতে মৌলিক ও স্থায়ী পরিবর্তন ঘটেছে এবং তার আর আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন নেই, তাহলে তার শরণার্থী মর্যাদা বাতিল বা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১সি(৫)-এ উল্লেখ আছে, আশ্রয়ের কারণ শেষ হলে স্ট্যাটাসও শেষ।অর্থাৎ, যদি আদালত মনে করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে গেছে এবং আবেদনকারী আর ঝুঁকিতে নেই, তাহলে তার আশ্রয় আবেদন বাতিল হতে পারে, এমনকি পূর্বের স্ট্যাটাসও রিভিউ হতে পারে।
বিগত দেড় দশকে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি দাবি করেছিলেন তারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখন আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন, যে দলকে ভয় দেখিয়ে আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, সেই দল ক্ষমতায় নেই, তাহলে ভয় কি এখনও বাস্তব?
লন্ডনভিত্তিক আইনজীবীদের মতে, আদালত এখন তিনটি বিষয় খতিয়ে দেখছে। প্রথমত আবেদনকারীর ব্যক্তিগত মামলা কি সত্যিই আলাদা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রতিপক্ষ বা ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে কি না। তৃতীয়ত দেশে ফিরে গেলে নির্দিষ্ট ঝুঁকি প্রমাণ করা যাচ্ছে কি না। শুধু দলীয় পরিচয় এখন আর যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে না।
২০২৪ সালে প্রায় ৭ হাজার ২২৫ জন বাংলাদেশি আশ্রয় আবেদন করেছে। ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশ শীর্ষ আবেদনকারী ৫ দেশের একটি। এছাড়া কয়েক হাজার বাংলাদেশির মামলা এখনও পেন্ডিং।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব আবেদন বাতিল হবে না, কিন্তু “গ্রুপ-ভিত্তিক আশ্রয়” প্রায় বন্ধ হয়ে “কেস-ভিত্তিক আশ্রয়” যুগ শুরু হচ্ছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে। সাবেক ক্ষমতাসীন দলের বহু নেতা-কর্মীও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চাইছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদনও পাচ্ছেন। এতে আদালতের কাছে একটি বাস্তব বার্তা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক ঝুঁকি দলভেদে বদলাচ্ছে, স্থায়ী নয়।
২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা-লন্ডন সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলে প্রত্যাবাসন দ্রুত হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এতে তিন ধরনের মানুষ সবচেয়ে ঝুঁকিতে, এর মধ্যে যাদের মামলা দুর্বল, যারা শুধু দলীয় পরিচয়ে আশ্রয় চেয়েছে এবং যাদের দেশে ফেরার ব্যক্তিগত ঝুঁকি প্রমাণ নেই।
একই ধরনের নীতি পর্যালোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে, কারণ ইউরোপীয় আশ্রয় আইন অনেকটাই সমন্বিত নীতিতে চলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে তিনটি বাস্তবতা দেখা যেতে পারে্।পুরোনো স্ট্যাটাস রিভিউ, যেমন অনেকের শরণার্থী মর্যাদা পুনর্মূল্যায়ন হবে। পেন্ডিং কেসের বড় অংশ বাতিল, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়-নির্ভর আবেদন। এছাড়া ব্যক্তিগত নির্যাতনের প্রমাণই হবে একমাত্র পথ, যেমন গ্রেফতারি পরোয়ানা, হামলার প্রমাণ,
বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল শুধু দেশের রাজনীতিই বদলায়নি, বিদেশে থাকা হাজারো মানুষের আইনি পরিচয়ও অনিশ্চিত করে দিয়েছে। আগে যেখানে “দলীয় পরিচয়” ছিল আশ্রয়ের মূল হাতিয়ার, এখন সেখানে আদালতের একটাই প্রশ্ন- আপনি ব্যক্তিগতভাবে এখনও ঝুঁকিতে আছেন, তা প্রমাণ করতে পারবেন?এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, হাজারো বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ থাকবে ইউরোপে, নাকি ফিরতে হবে দেশে।


