যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল ওল্ডহ্যাম হাসপাতাল’ -এ কর্তব্যরত এক নার্সকে হত্যাচেষ্টার দায়ে ৩৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নাগরিক মোহাম্মদ রোমান হক (রুমন হক)-কে ২৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ‘ম্যানচেস্টার মিনশুল স্ট্রিট ক্রাউন কোর্ট’। মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালত এই রায় ঘোষণা করে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও আদালতের নথি অনুযায়ী, বিচারক বলেন,
“স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এমন সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।”
এই রায়কে যুক্তরাজ্যে হাসপাতাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম কঠোর দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন আইনবিশেষজ্ঞরা। ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাতে এ ঘটনাটি ঘটে। রোমান হক তখন হাসপাতালের অ্যাকিউট মেডিক্যাল ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাদকাসক্ত রোগীদের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে দেওয়া মেথাডোন পেতে দেরি হওয়ায় তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
হাসপাতালের ভেতর থেকে ধারালো কাঁচি সংগ্রহ করে তিনি পকেটে লুকিয়ে রাখেন। এরপর দায়িত্বে থাকা নার্স আচিমা চেরিয়ানের ওপর আকস্মিক হামলা চালায় এবং তার ঘাড় ও শরীরের ওপর একাধিক আঘাতের চেষ্টা করেন রোমান হক। দ্রুত সহকর্মীরা এগিয়ে আসায় নার্স প্রাণে বেঁচে যান। আদালত জানিয়েছে, আক্রমণটি জীবননাশের স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল।
আসামিপক্ষ মানসিক সমস্যার যুক্তি তুলে ধরলেও তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। চিকিৎসা নথিতে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের মাদক ও অ্যালকোহল আসক্তি, ড্রাগ উইথড্রয়াল সিনড্রোম এবং উত্তেজনা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রবণতা। প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়, এটি পরিকল্পিত আচরণ, কারণ হামলার আগে তিনি অস্ত্র সংগ্রহ ও লুকানোর সুযোগ নিয়েছিলেন।
তদন্তে কয়েকটি উদ্বেগজনক আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। এরমধ্যে রয়েছে ধারালো চিকিৎসা সরঞ্জাম তালাবদ্ধ থাকা, অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে নজরদারিতে দুর্বলতা ও উচ্চ ঝুঁকির রোগীর পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ না করা।এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে “হাই-রিস্ক পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট” প্রটোকল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ওল্ডহ্যামের বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলেছেন, ঘটনাটি নিন্দনীয়, কিন্তু হাসপাতালের অবহেলাও তদন্ত করা দরকার। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত দাবিও করেছেন স্থানীয়রা ।
যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে।বিশেষ করে জরুরি বিভাগ ও মাদকাসক্ত রোগীদের ওয়ার্ডে ঝুঁকি বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি কারণে সমস্যা বাড়ছে, মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও হাসপাতালের কর্মী সংকট।
বিচারক রায়ে বলেন, হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত, নার্সের জীবন বিপন্ন হয়েছিল ও জনসেবামূলক পেশার নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোর শাস্তি জরুরি। রায়ের পর সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে, হাসপাতালের নিরাপত্তা নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন, উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ ইউনিট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আইনি সুরক্ষা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলার রায় নয়, যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকসংকট, এই তিন সংকটের মিলিত প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় কঠোর বার্তা দিল আদালত, আর একই সঙ্গে হাসপাতাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনে দিল এই মামলা।


