ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু সেই বাস্তবতাকেই সীমাবদ্ধ করার পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্য। ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে সরকার দ্রুত আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে। বিষয়টি এখন কেবল প্রযুক্তি নীতি নয়; এটি শিশু সুরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সবকিছুর মিলিত প্রশ্ন।
এই উদ্যোগের কেন্দ্রে আছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, যিনি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, ১৬ বছরের নিচে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং দ্রুত আইনগত সংস্কারের অংশ হিসেবে বিষয়টি পর্যালোচনায় আছে।
প্রেক্ষাপট
গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, অনলাইন বুলিং, আত্মক্ষতি-সংক্রান্ত কনটেন্ট এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর আসক্তিমূলক ডিজাইনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩-১৫ বছর বয়সীরা দিনে কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে কাটাচ্ছে, বডি-ইমেজ, তুলনামূলক জীবনধারা ও ‘লাইক’-সংস্কৃতি, একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে যে সম্মান, মূল্যবোধ বা আত্মবিশ্বাস অনুভব করে, তা কমিয়ে দিচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ও স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট রিকমেন্ডেশন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সরকারের যুক্তি, শিশুদের জন্য যেভাবে তামাক, অ্যালকোহল বা ড্রাইভিংয়ে বয়সসীমা আছে, তেমনি সোশ্যাল মিডিয়াতেও আইনি সীমা থাকা উচিত।
যে আইন আসতে পারে
সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যমান অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩-এর কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্ভাব্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৬ বছরের নিচে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ট্রেলিয়া-ধাঁচের মডেল বিবেচনায় রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ। সরকারি আইডি যাচাই, বায়োমেট্রিক বা ফেস-এজ-এস্টিমেশন প্রযুক্তি ও মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক-ভিত্তিক যাচাইকরণ। এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক, গোপনীয়তা বনাম সুরক্ষা।
এ আই চ্যাটবট ও অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ
এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট বা রিকমেন্ডেশন সিস্টেম শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্টে ঠেলে দিলে কোম্পানিকে দায়ী করা হতে পারে।
প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর চাপ
সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বড় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে, শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপদ সংস্করণ তৈরি করতে হতে পারে, ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ বা আসক্তিমূলক ডিজাইন কমাতে হতে পারে এবং বয়স যাচাইকরণ ব্যর্থ হলে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চাপও তৈরি করবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা
এই প্রস্তাব ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বড় ইস্যু হয়ে উঠছে। সমর্থনকারীরা বলছে, এতে স্কুলে মনোযোগ বাড়বে, অনলাইন বুলিং কমবে ও অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হবে। আর সমালোচকরা বলছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন, কিশোররা ‘ভিপিএন’ ব্যবহার করে নিয়ম এড়িয়ে যাবে, খবর, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমবে এবং রাষ্ট্র অতিরিক্ত নজরদারির পথে হাঁটবে। ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, বয়স যাচাইকরণ বাধ্যতামূলক হলে ব্যাপক ডেটা সংগ্রহের ঝুঁকি তৈরি হবে।
ইউরোপ ও বৈশ্বিক প্রভাব
যুক্তরাজ্য একা নয়। অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের পথে গেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও শিশুদের অনলাইন ব্যবহারে কঠোর নীতির কথা ভাবছে। অর্থাৎ, একটি নতুন বৈশ্বিক ট্রেন্ড তৈরি হচ্ছে “ডিজিটাল প্রাপ্তবয়স্কতা” নির্ধারণ। আগে ভোটাধিকার, ড্রাইভিং, বিয়ে, এসবের বয়সসীমা ছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, অনলাইন নাগরিক হওয়ার বয়স কত?
নিষেধাজ্ঞা ই কি সমাধান
বিশ্লেষকদের মতে, পুরো নিষেধাজ্ঞা হয়তো সমস্যার মূল সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন, ডিজিটাল শিক্ষা, পিতামাতার সক্রিয় ভূমিকা, অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা ও প্ল্যাটফর্ম দায়বদ্ধতা।নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে শিশুরা হয়তো আরও অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে, যেখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
সুরক্ষা না স্বাধীনতা
যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। এটি কেবল একটি আইন নয়, এটি প্রযুক্তি কোম্পানি, পরিবার, রাষ্ট্র এবং কিশোর প্রজন্মের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা।
যদি আইন পাস হয়, তাহলে ১৩-১৫ বছর বয়সীদের ডিজিটাল জীবন আমূল বদলে যাবে। আর যদি পাস না হয়, তবুও বিতর্কটি প্রমাণ করছে, সোশ্যাল মিডিয়া আর কেবল বিনোদন নয়, এটি এখন জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নীতির প্রশ্ন।


