বিশ্বরাজনীতিতে এই সপ্তাহে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একাধিক সমন্বিত বার্তা এসেছে যা ইউরোপ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য ও নিরাপত্তা স্থাপনায় দ্বন্দ্ব ও কূটনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আশ্বস্ত বার্তা
ইউরোপীয় স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিউনিখ সম্মেলনে বলেন, তারা ইউরোপকে নিরাপত্তা গঠনে সমর্থন জানাবে ও ট্রান্সআটলান্টিক নির্ভরতা বজায় রাখবে, অর্থাৎ ইউরোপ ও আমেরিকার ঐতিহাসিক সহযোগিতা চালু থাকবে। ফলে পশ্চিমা জোটের ভিত্তি দুর্বল হবে না, এমন বার্তা দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ওই বক্তব্যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা চুল্লির সামনে ইউরোপের অবস্থান আর স্থিতিশীল করার ইচ্ছা প্রকাশ পেলেও তা সশস্ত্র প্রতিশ্রুতি বা পরিপূর্ণ অস্ত্রায়নের অঙ্গীকার নয় বলে অভূতপূর্ব ভঙ্গিতে বিশ্লেষকরা দেখছেন।
যুক্তরাজ্যের কঠোর বার্তা
অন্যদিকে কিয়ার স্টারমার, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, একই সম্মেলনে ইউরোপীয় নিরাপত্তার পুনর্গঠনকে একটি লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন যে ইউরোপকে ইতালির মতো নিরাপত্তা স্বায়ত্তশাসন ও নাটোতে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে এবং যুক্তরাজ্যের ভূমিকাই হবে কেবল সুরক্ষা স্বল্পায় উৎসাহ দেওয়ার চেয়ে বরং সক্রিয় পরিকল্পক ও প্রস্তুত বাহিনী হিসেবে কাজ করার। স্টারমার যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মধ্যে যৌথ অস্ত্র সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পুরোনো জোটের আভিজাত্য পুনরুদ্ধারে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা দরকার বলেও মন্তব্য করেছেন।
ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন
এই দুই নেতার বার্তা একে‑অপরের পরিপূরক হলেও আসলে এমন ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন যা পশ্চিমা জোটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা ইউরোপকে সহযোগিতা ও আশ্বাস দেবে, কিন্তু যুক্তরাজ্য বলছে, মাত্র আশ্বাসই যথেষ্ট নয়, ইউরোপকে নিজেই শক্ত থাকতে হবে। স্টারমারের বক্তব্যে পরিণতি মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইইউ ও ইউকে‑এর যৌথ উদ্যোগ, সামরিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নাটোতে সক্রিয় ভূমিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাক্ষরিত প্রতিশ্রুতির চেয়ে অধিক স্বাধীন ইউরোপীয় নীতির আহ্বান ছড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় নেতারা ব্যাপকভাবে এতে সমর্থন জানিয়েছেন, যদিও তারা ভয়ও প্রকাশ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা অনেক সময় “ট্রানজেকশনাল” অর্থাৎ স্বার্থ নির্ভর, মেজাজের হতে পারে, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা স্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী নীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।একদিকে রুবিওয়ের বক্তব্যে সমর্থন ও ঐক্যের বার্তা থাকলেও অন্যদিকে বিশ্লেষকরা এটিকে শর্তসাপেক্ষ চুক্তির মতো দেখছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্থায়ী বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে চাইবে না।
ক্লান্ত নয়, প্রস্তুত হতে হবে
পরিশেষে মিউনিখ সম্মেলন থেকে স্পষ্ট হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে নিরাপত্তা আশ্বাস দিচ্ছে কিন্তু, যুক্তরাজ্য বার্তা দিচ্ছে ইউরোপকে নিজেকেই শক্তিশালী হতে হবে। এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলো কেবল অভিন্ন নেতৃত্ব বা বড় প্রত্যাশায় ভরসা না রেখে, নিরাপত্তা খাতে নিজস্ব উদ্যোগ, যৌথ অস্ত্র সংগ্রহ ও সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তুলতে বাধ্য হবে, সেনা, অর্থায়ন এবং কূটনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্রে, পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি স্বনির্ভর দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া অন্য উপায় নেই।
এই দ্বৈত ভাষণ ইউরোপ পুনর্গঠনের যাত্রাকে শুধু আশ্বাসের হাতছানি নয়, বরং কঠিন প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য লড়াইয়ের পরীক্ষায় নামার সংকেতও জারি করেছে।


