পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সম্মেলন ওয়েব সামিট ২০২৫, যেখানে এ বছর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও চীনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন।
এআই ও ‘ভাইব কোডিং’ নতুন দিগন্তে
এ বছরের ওয়েব সামিটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় “ভাইব কোডিং” এমন এক প্রোগ্রামিং পদ্ধতি যেখানে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোড তৈরি করতে পারে। আলোচনার মূল ফোকাস দুটি প্রশ্নকে ঘিরে-এটি কি প্রোগ্রামিংয়ের পরবর্তী বড় বিপ্লব? নাকি এটি প্রোগ্রামারদের ভূমিকার সমাপ্তির সূচনা?

এছাড়া, কে এআই নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এর লাভ কারা পাচ্ছে সেই প্রশ্নেও চলছে গভীর বিতর্ক। ওয়েব সামিট কর্তৃপক্ষ জানায়, অনলাইন কনটেন্টের ওপর প্রশিক্ষিত এআই মডেলগুলোর কারণে তথ্য, প্রবেশাধিকার ও মুনাফার প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তীব্র।
ওয়েব সামিট: এক বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম
২০০৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে যাত্রা শুরু করে ওয়েব সামিট, যা ২০১৬ সালে লিসবনে স্থানান্তরিত হয়।
এটি বিশ্বের উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক নেতাদের একত্রিত করে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রবণতা ও উদ্ভাবন নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

চায়না সামিট: উদ্ভাবনের মঞ্চে চীনের অগ্রযাত্রা
এই বছর ওয়েব সামিটে যুক্ত হয়েছে বিশেষ আয়োজন “চায়না সামিট”, যেখানে আলাদা মঞ্চ, নির্দিষ্ট দিন ও বক্তাদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। মিডিয়া, শিল্পখাত ও একাডেমিয়ার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন। তারা দেখাচ্ছেন, কীভাবে চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এআই, গভীর প্রযুক্তি গবেষণা এবং শিল্প রূপান্তরের পথে।
উদ্বোধনী পর্বে পর্তুগালের রাষ্ট্র সংস্কার মন্ত্রী গনসালো মাতিয়াস বলেন, ডিজিটাল বিপ্লব আমাদের জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ, যা নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন সমৃদ্ধি সৃষ্টি করবে। তিনি আরও যোগ করে বলেন, পর্তুগাল প্রস্তুত এআই ক্ষেত্রে উৎকর্ষের কেন্দ্র হতে। দেশটি ব্যয় সাশ্রয়ী এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন।
প্রাইভেট জেটের চাপ সামলাতে হিমশিম লিসবন বিমানবন্দর
ওয়েব সামিট চলাকালীন সময় প্রাইভেট জেট নিয়ে আসা অতিথিদের জন্য দেখা দিয়েছে বড় সংকট। লিসবন বিমানবন্দর ও আশপাশের ছোট বিমানবন্দরগুলোতে স্লটের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেককেই বাধ্য হয়ে স্পেন পর্যন্ত উড়ে যেতে হচ্ছে। আয়োজকদের পাঠানো এক ইমেইলে বলা হয়েছে, লিসবন বিমানবন্দর বর্তমানে অতিরিক্ত ট্রাফিক সামলাতে পারছে না, যার ফলে টেকঅফ ও ল্যান্ডিং স্লট সীমিত হয়ে পড়েছে।
তারকা উপস্থিতি ও টেক জায়ান্টদের মিলনমেলা
উদ্বোধনী পর্বে রঙিন আলোয় জমকালো মঞ্চে ছিলেন, লাভেবল ভাইব কোডিং কোম্পানির সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক টেনিস তারকা মারিয়া শারাপোভা, জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার খাবি লেম।

প্রযুক্তির পাশাপাশি এবারও ওয়েব সামিটে অংশ নিচ্ছেন ক্রীড়া জগতের তারকারাও, বিশেষ করে ফর্মুলা ১-এর দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব-টোতো উলফ, মেরসেডিজ এএমজি পেট্রোনাস এফ১ টিমের প্রধান লরেন্ট মেকিস, ওরাকল রেড বুল রেসিং-এর টিম প্রিন্সিপাল ও সিইও।
টেক দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে স্টার্টআপ ও বড় কোম্পানিগুলো
ওয়েব সামিটের সিইও প্যাডি কসগ্রেভ জানান, লিসবনে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে টানা দশম বছর। এই সময়ের মধ্যে রেভোলুট-এর মতো কোম্পানিগুলো বড় পরিসরে বেড়ে উঠেছে। এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে মেটা, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, বোস্টন ডায়নামিকসসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

তিনি আরও জানান, এ বছর সবচেয়ে বেশি স্টার্টআপ এসেছে পোল্যান্ড থেকে, যেখানে জার্মানির উপস্থিতি কিছুটা কমেছে। এছাড়া, বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় চীনা প্রযুক্তির উত্থানও আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
এআই-এর বিদ্যুৎ চাহিদা ও টেকসই ইউরোপের ভূমিকা
আলোচনায় উঠে এসেছে এআই-এর বিপুল শক্তি খরচ বিষয়টিও। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ১.৫ শতাংশ বা ৪১৫ টেরাওয়াট আওয়ার ব্যবহার করেছে, যা গত পাঁচ বছরে প্রতি বছর গড়ে ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইউরোনিউজ আয়োজিত এক সেশনে আলোচনা হবে, ইউরোপ কীভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে এআই উন্নয়নকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে পারে। এতে থাকবেন স্টার্ট ক্যাম্পাস-এর সিইও (নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর ডেটা সেন্টার নির্মাতা) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি এনস্কেল(Nscale) -এর প্রতিনিধি (উন্নত এআই অবকাঠামো নির্মাতা)।
আয়োজনে অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান

এই বছরের ওয়েব সামিট, যা চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত, সেখানে উপস্থিত হবেন, ৭০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী, আড়াই হাজারেরও বেশি স্টার্টআপ, যারা নিজেদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করবে, এবং ১ হাজারেরও বেশি বিনিয়োগকারী।


