বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলায় ২০২৬ সালে ব্যয় আরও বাড়াচ্ছে ফ্রান্স। দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট গত বছরের ডিসেম্বরে ২০২৬ সালের অর্থবিল অনুমোদন করেছে, যেখানে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ২.১৬ বিলিয়ন ইউরো। এটি ২০২৫ সালের তুলনায় ৮০ মিলিয়ন ইউরো বেশি, যা ফ্রান্সের ইতিহাসে এই খাতে অন্যতম সর্বোচ্চ বরাদ্দ।

ফরাসি সরকার বলছে…

নতুন প্রশাসনিক আটককেন্দ্র নির্মাণ, বহিষ্কার প্রক্রিয়া জোরদার, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ইউরোপীয় আশ্রয় ও অভিবাসন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য এই অতিরিক্ত অর্থ অপরিহার্য।

২০২৬ সালের বাজেট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরো নুনেজ ৮ ডিসেম্বর সিনেটের অর্থ কমিশনের সামনে বলেন…

বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তার ভাষায়, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও একীভূতকরণ সংক্রান্ত ২০২৪ সালের আইন বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক আটককেন্দ্রের ধারণক্ষমতা বাড়াতে এই বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেট বৃদ্ধির প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হলো অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিদেশিদের জন্য নতুন প্রশাসনিক আটককেন্দ্র -সিআরএ নির্মাণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর ফ্রান্সের ডানকের্কে চলমান সিআরএ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, বোর্দুশহরে ২০২৬ সালে একটি নতুন সিআরএ নির্মাণ শুরু, রেন শহরের সিআরএ-তে যুক্ত হবে ৫২টি নতুন আসন এবং মেত্জ শহরের সিআরএ-তে যুক্ত হবে আরও ২৮টি আসন, এর ফলে ২০২৬ সালে ফ্রান্সজুড়ে মোট আটকক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ২৯৯ জনে।

এই পরিকল্পনা নতুন নয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানা ২০২৩ সালের অক্টোবরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সিআরএ-তে আসন সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৯ থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজারে উন্নীত করা হবে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরো নুনেজ জানিয়েছেন, তিনি তার পূর্বসূরির সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ডানপন্থি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিনেট উল্লেখ করে, ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের হার এখনো অত্যন্ত কম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন কার্যকর হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৮৫৬টি, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। যদিও ২০২৪ সালে ‘ওকিউটিএফ’ (ফরাসি ভূখণ্ড ত্যাগের নির্দেশ) বাস্তবায়নের হার বেড়ে ১১.৪ শতাংশে পৌঁছায়।২০২৫ সালে তা আবার কমে ১০.৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

সিনেটের মতে, এই হার অত্যন্ত অপ্রতুল এবং বহিষ্কার নীতিকে আরও কার্যকর করতে অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানো জরুরি। অভিবাসী অধিকার সংগঠন লা সিমাদ-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআরএ-তে আটক অভিবাসীদের বড় অংশই মাগরেব অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক। ২০২৪ সালে আটক হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে ছিলেন, প্রায় ৫ হাজার আলজেরিয়ান, ১ হাজার ৯০০ টিউনিশিয়ান ও ১ হাজার ৭০০ মরক্কোর নাগরিক। এছাড়া আরও আটক হন, প্রায় ৭০০ রোমানিয়ান, ৪৫০ আলবেনীয়, ৩৫০ গিনিয়ান, ৩০০ আফগান এবং ৩০০ আইভোরি কোস্টের নাগরিক।

সিনেটের সামনে লরো নুনেজ জানান, সিআরএ-তে তিন হাজার আসন তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি আশাবাদী, তবে সময়সীমা পিছিয়ে এখন ২০২৯ সাল নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭সালে দিজোঁ শহরে ১৪০ আসনের নতুন সিআরএ চালু, যার মোট ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৪৩৯, ২০২৮সালে নঁত, বেজিয়ের, ওয়াসেল ও মেনিল-আমেলোতে নতুন সিআরএ, যার ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৯২৩ এবং ২০২৯সালে এক্স-লুইনে ১৪০ আসনের সিআরএ যার মোট ধারণক্ষমতা হবে ৩ হাজার ৬৩।

বাজেট বৃদ্ধির দ্বিতীয় বড় লক্ষ্য হলো ইউরোপীয় আশ্রয় ও অভিবাসন চুক্তি বাস্তবায়ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ফ্রান্স সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যে বাড়তি বাজেট দিচ্ছে, সেই টাকা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডেটাবেজ হালনাগাদ, নতুন নজরদারি ও প্রশাসনিক সরঞ্জাম, নতুন নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে।

ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য হলো আশ্রয় ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, অনিয়মিত প্রবেশ নিরুৎসাহিত করা এবং নিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহ দেওয়া।

গত ডিসেম্বরে ইইউভুক্ত দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছান। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইইউর বাইরে ‘রিটার্ন সেন্টার’ স্থাপন, আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত অভিবাসীদের সেখানে পাঠানো ও বহিষ্কার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা। এই প্রস্তাবগুলো ২০২৬ সালের মার্চে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের বাড়তি বাজেট ও ইউরোপজুড়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ আরও কঠিন হতে যাচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version