সোমবার, ২রা নভেম্বর, ২০২৬   |   ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রবিধান সংবলিত ডিক্রি-আইন অনুমোদন করেছে পর্তুগাল সরকার। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের পর্তুগিজ নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতর শর্তাবলি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এই ডিক্রি-আইনটি অনুমোদিত হয়। এতে নাগরিকত্ব প্রার্থীদের পর্তুগিজ ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত জ্ঞান কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।

এছাড়া আবেদনকারীদের আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ দাখিলের পদ্ধতি, পর্তুগালের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক নীতির প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশ এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে এতে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশটির পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব আইনে আনা সংশোধনের ধারাবাহিকতায় এই সিদ্ধান্ত এলো; যার মধ্যে ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনে বৈধভাবে বসবাসের সময়সীমা বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছিল।

সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে সাত বছর এবং অন্যদের জন্য দশ বছরের বৈধ বসবাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পর্তুগিজ ভাষাভাষী আফ্রিকান দেশগুলোর নাগরিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের জন্য সাত বছরের মেয়াদ প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছে সরকার। অন্যদিকে অন্যান্য দেশের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত দশ বছর বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হবে।

এই নতুন বিভাজন সেই সব বিদেশি বাসিন্দাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যাঁরা পর্তুগালের আগের পাঁচ বছরের বসবাসের শর্তের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের নাগরিকত্ব আবেদনের পরিকল্পনা করেছিলেন।

তবে সরকার সদ্য অনুমোদিত এই প্রবিধানের সব ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক খুঁটিনাটি এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করেনি। ইতিমধ্যে যেসব আবেদন জমা পড়েছে বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে এই নতুন নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা চূড়ান্ত গেজেট বা আইনি বিধান প্রকাশের পরই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

পর্তুগালের প্রেসিডেন্সি বিষয়ক মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো এই পরিবর্তনগুলোকে দেশটির সঙ্গে আবেদনকারীদের আরও সুদৃঢ় ও বাস্তবিক সংযোগ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের পর তিনি জানান, সংশোধিত আইনে সমাজের সঙ্গে একাত্মতা এবং দেশ সম্পর্কে জানার বিষয়টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন অনুমোদিত বিধিমালার মাধ্যমে আবেদনকারীদের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত জ্ঞান যাচাইয়ের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া আবেদনকারীদের জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থান প্রদর্শনের নিয়মাবলিও এতে রয়েছে; যদিও নির্দিষ্ট আয়ের সীমা বা প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের তালিকা এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

আরেকটি অন্যতম শর্ত হলো পর্তুগালের গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের নীতিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে ঘোষণাপত্র প্রদান করা। পাশাপাশি নাগরিকত্ব আবেদনের অংশ হিসেবে আবেদনকারীদের বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়ার প্রক্রিয়াও অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

তবে সম্ভাব্য আবেদনকারীদের জন্য আইনের সাধারণ শর্তাবলি এবং প্রবিধানের প্রায়োগিক নিয়মের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা জরুরি। মন্ত্রিপরিষদ ডিক্রি-আইন অনুমোদন করলেও এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য এবং এটি কবে থেকে কার্যকর হবে তা জানার জন্য সরকারি গেজেট ‘দিয়ারিও দা রিপাবলিকা’য় প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।যোগ্যতার কঠোর শর্ত আরোপের পাশাপাশি নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও কম আমলাতান্ত্রিক বা সহজ করার কথা জানিয়েছে সরকার।

নতুন বিধিমালার আওতায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোকে সহজ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান উন্নত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ফলে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যে সংরক্ষিত থাকা নথিপত্র আবেদনকারীদের নতুন করে সংগ্রহ করার ঝামেলা কমতে পারে।

সরকারের দাবি, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানো এবং দীর্ঘসূত্রতা কমানো; যদিও আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়া বিদেশি নাগরিকদের কাছে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে তা বাস্তবায়নের ওপর।


এদিকে পেদ্রো পর্তুগাল গাসপারের বিদায়ের পর ‘এজেন্সি ফর ইন্টিগ্রেশন, মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’ (আইমা)-এর নতুন সভাপতি হিসেবে সিজার টেক্সেইরাকে নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পর্তুগালের সাবেক অভিবাসন পরিষেবা (এসইএফ) পুনর্গঠনের পর গঠিত আইমা প্রতিষ্ঠার তিন বছর পূর্তির মুখে এই নতুন নিয়োগ এলো।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় সংস্থাটিতে সেবাগ্রহীতাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এ বছর সংস্থাটি ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে সরাসরি সেবা দিয়েছে এবং প্রায় ৫ লাখ টেলিফোন কল নিষ্পত্তি করেছে।লেইতাও আমারো জানান, আইমা এখন ডিজিটাল রূপান্তর, গণমুখী সেবার মান উন্নয়ন এবং অভিবাসীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এক নতুন ধাপে প্রবেশ করছে।

তবে মাইগ্রেশন টেকনিশিয়ানস ইউনিয়ন সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, শুধু নতুন একজন সভাপতি নিয়োগ দিলেই কর্মী সংকট, দুর্বল পরিকল্পনা ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। ইউনিয়নটি নতুন সভাপতিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আইমার সামগ্রিক কার্যক্রমে কার্যকর ও টেকসই সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।

পর্তুগালে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য এই দুটি ঘোষণাই নাগরিকত্ব অর্জনের শর্ত এবং অভিবাসন দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রশাসনের ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রবিধানের পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ, যা পাওয়ার পর আবেদনকারী ও আইনজীবীরা বুঝতে পারবেন নতুন এই নিয়মাবলি বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version