বৃহৎ প্রত্যাশা, নতুন ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক অংশগ্রহণ, এসব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও পরিবর্তনময় সমাবেশ হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন শুধু দেশেই নয়, ভোর নতুন ধারা হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীর ভোটাধিকার কার্যকর হওয়ার মাধ্যমেও অনন্য নজির সৃষ্টি করছে।
এই নির্বাচনে শুধু ৩০০টি সংসদীয় আসনে ভোট হয়েই নয়, একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে যা বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
দেশব্যাপী উৎসবমুখর ভোটের প্রচারণা শেষ হয়ে ভোট গ্রহণ মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষায়। সাধারণ মানুষ থেকে প্রার্থী, সকলেই এখন ভোটের জন্য অপেক্ষায় মনোযোগ দিচ্ছে। এবারের নির্বাচন গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের পরীক্ষণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন পরিবর্তন ও সম্ভাব্য শক্তির শিফটের প্রতিচ্ছবি, বিশেষ করে দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত হওয়ায়।
প্রবাসীর ভোটাধিকার
এ নির্বাচনকে অনন্য করে তুলেছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পোস্টাল ভোট, যা এই নির্বাচনে প্রথমবার ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে যার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধন করেছেন এবং পোস্টাল ব্যালট পেয়েছেন। মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজর ৬৮৪ জন ভোটার (দেশ ও প্রবাস মিলিয়ে) এই অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ভোটে নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ভোট প্রবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রবাসী ভোটাররা ইতোমধ্যেই তাদের পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ ও ব্যবহারে ব্যাপক অংশগ্রহণ করছেন। প্রায় ৫ লাখেরও বেশি প্রবাসী ভোটার ইতোমধ্যেই ভোট দিয়েছেন বা ভোট প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ফেরত আসা ব্যালটও প্রতিনিয়ত দেশে পৌঁছাচ্ছে এবং ইসি তা সংগ্রহ করছে, ভোটের দিন পর্যন্ত প্রতিটি ভোট গ্রহণযোগ্য হবে যদি তা সময়মতো বাংলাদেশের যত্নশীল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।
গ্লোবাল ভোটার অংশগ্রহণ
এই পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্য বা একাদিক ক্যাম্পেইনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ইউরোপ ও আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে। সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, ওমান ও ইউএই প্রভৃতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে প্রচুর ভোট এসেছে এবং অনেকে ইতোমধ্যেই নিজেরা ভোট দিয়েছেন। ইউরোপের দেশগুলো যেমন যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ইত্যাদি থেকেও অনেকে ভোট দিয়েছে এবং তা এখন দেশে পৌঁছানো হচ্ছে। আমেরিকা, কানাডা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাংলাদেশিরাও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছে, এতে প্রবাসীরা দেশের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে পারছেন।
এই বিশাল সংখ্যা প্রমাণ করে কিভাবে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিনিয়ত দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে, এবং আগামীতে তাদের ভোটের প্রতি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ের গুরুত্ব বাড়বে।
দেশভিত্তিক প্রবাসী ভোটের অংশগ্রহণ
একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রবাসী ভোটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে, সৌদি আরব (১লাখ ৫৮ হাজার ৭৩১), কাতার (৪৯ হাজার ৫৬৯), মালয়েশিয়া (৪৮ হাজার ২৯১), ওমান (৪৫ হাজার ২৭৪), যুক্তরাজ্য (২২ হাজার ১৬), যুক্তরাষ্ট্র (১৭ হাজার ৫৪৭), ইতালি (১৪ হাজার ১০৩) ও কানাডা (১০ হাজার ২০০) থেকে। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করা বাংলাদেশিরা সক্রিয়ভাবে ভোটে অংশ নিচ্ছেন।
পোস্টাল ভোট প্রক্রিয়া
প্রবাসীরা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেন। অ্যাপটি কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অঞ্চলভিত্তিক নিবন্ধন উইন্ডো চালু করেছিল। ইসি পোস্টাল ব্যালটগুলো প্রবাসী ভোটারদের ঠিকানায় আন্তর্জাতিক ডাইরেক্ট মেইল ও বিমানের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। ভোটাররা ব্যালট গ্রহণ করে তাকে পূরণ করে স্থানীয় পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠিয়েছে।তবে ভোটের দিন বিকাল পর্যন্ত ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছলে সেগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য প্রবণতা
প্রবাসীদের ভোটের নেতিবাচক বা ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকরা নানা প্রশ্ন তুলছেন, প্রচলিত মত অনুযায়ী বিএনপি ও এর জোটগুলোর সমর্থন প্রবাসীদের মধ্যে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে। তবে গ্লোবাল ভোট বিভাজন কখনও একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে একচেটিয়া প্রভাব ফেলতে নাও পারে। পোস্টাল ভোট চালু হওয়ায় বাংলাদেশের প্রবাসীদের ভোটাধিকার বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতি নির্ধারণে প্রবাসীদের অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষণ
প্রথমবারের মতো এত বিশাল প্রবাসী অংশগ্রহণ, যা ভবিষ্যতে নির্বাচন ও রাজনীতিতে তাদের প্রভাবকে দৃঢ় করবে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সহজতায় নতুন দিগন্ত খুলেছে। প্রবাসীরা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও সক্রিয়, এটা প্রমাণ করে যে ভোটাররা নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী। এই নির্বাচন শুধু লোকাল নয়, এটি একটি গ্লোবাল ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আরো গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থাপনের মাইলস্টোন।
শেষ কথা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি বাংলাদেশে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ, আধুনিক ভোট ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভোটাধিকার নিশ্চিত করার এক নতুন দৃষ্টান্ত। বিশ্বের নানা প্রান্তে থাকা বাংলাদেশিরা বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ভবিষ্যত নির্ধারণে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন, এটি আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নীতি নির্ধারণে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে।
