বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসলামের বরকতময় রজনীগুলোর মধ্যে শবেবরাত একটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন রাত। আরবি ক্যালেন্ডারের শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি মুসলমান সমাজে লাইলাতুল বরাআত নামে পরিচিত। ‘শবেবরাত’ ফারসি শব্দ-যার অর্থ মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অসংখ্য বান্দার গুনাহ মাফ, রিজিক বৃদ্ধি ও আগামী জীবনের অনেক ফয়সালা হয়, এমন বিশ্বাস দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম সমাজে প্রচলিত।

তবে এই রাতের ফজিলত, আমল ও সীমাবদ্ধতা, সবকিছুই কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বোঝা জরুরি।

কোরআনের আলোকে শবেবরাত: তাকদির ও ফয়সালার রাত

কোরআনে সরাসরি ‘শবেবরাত’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও সূরা আদ-দুখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী, সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।”

(সূরা আদ-দুখান: ৩–৪)

তাফসিরবিদদের মধ্যে এ আয়াতের ‘বরকতময় রাত’ কোনটি, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এটি লাইলাতুল কদর, তবে কিছু তাফসিরে শবেবরাতের দিকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ থেকেই বোঝা যায়, এই রাতকে ঘিরে তাকদির ও ফয়সালার ধারণা পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রাত হিসেবে কদরের রাতই অধিক শক্তিশালী মত।

হাদিসের আলোকে শবেবরাতের ফজিলত

শবেবরাতের মর্যাদা সম্পর্কে একাধিক হাদিস পাওয়া যায়, যদিও অধিকাংশই হাসান বা দুর্বল (দাঈফ) পর্যায়ের। তবে সম্মিলিতভাবে আলেমদের একটি বড় অংশ এই রাতের ফজিলত স্বীকার করেছেন। আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিলের রাত।

শবেবরাতের মূল শিক্ষা: আত্মশুদ্ধি ও তওবা

ইসলামে কোনো রাতই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। শবেবরাতের আসল শিক্ষা হলো, খাঁটি তওবা ও ইস্তিগফার, অতীতের ভুলের জন্য অনুশোচনা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধন।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নিয়মিত শা‘বান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন, যা এই মাস ও তার মধ্যরাতের গুরুত্ব নির্দেশ করে।

শবেবরাতে কী আমল করা সুন্নত ও গ্রহণযোগ্য

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই রাতে যেসব আমল করা যায়, নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও ইস্তিগফার, ব্যক্তিগত দোয়া ও গুনাহ ত্যাগের সংকল্প। তবে সমষ্টিগত বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাত বা নির্ধারিত দোয়ার সহিহ প্রমাণ নেই, এ বিষয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস সতর্ক করেছেন।

সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ও অপপ্রচার

শবেবরাতকে কেন্দ্র করে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে, এই রাতে মৃত আত্মা ঘরে আসে (কোরআন-হাদিসে প্রমাণ নেই), ভাগ্য শুধু এই রাতেই লেখা হয়, আতশবাজি ও উৎসব (ইসলামের রুহের পরিপন্থী), ইসলাম এই রাতকে নীরব ইবাদত ও আত্মসমালোচনার সময় হিসেবে দেখতে বলে।

শবেবরাত ও আধুনিক মুসলিম সমাজ

আজকের ব্যস্ত, ভোগবাদী জীবনে শবেবরাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমা চাইতে শেখা দুর্বলতা নয়, বরং ঈমানের শক্তি। এই রাত মুসলমানদের জন্য আত্মপর্যালোচনা, নৈতিক সংস্কার ও নতুন শুরুর সুযোগ।

শবেবরাত কোনো উৎসব নয়, বরং এটি রুহানিয়াত ও আত্মশুদ্ধির রাত। কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের শেখায়, এই রাতের প্রকৃত মর্যাদা অর্জন হয় ইখলাস, তওবা ও সংশোধনের মাধ্যমে।

আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অন্তরের পরিবর্তনই শবেবরাতের আসল সার্থকতা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version