বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউরোপীয় কমিশন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে একটি নতুন পাঁচ-বছরের অভিবাসন ও আশ্রয় কৌশলপত্র, যার উদ্দেশ্য হলো ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় দক্ষ ও যোগ্য মানুষের জন্য বৈধ ভিসা ও প্রবেশ পথকে সহজতর করা।

ইউরোপের নতুন নীতি

ইইউ কৌশলপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে , ইউরোপই ঠিক করবে কে ইউরোপে আসবে, কী শর্তে এবং কোন পথে আসবে,  অর্থাৎ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আইনগত প্রবেশ প্রক্রিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এবারের নীতিতে তিনটি মূল লক্ষ্য বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ ও পাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ করা। যুদ্ধ বা অত্যাচারের কারণে আসা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া। কাউকে বৈধভাবে বাজারজাত করে দক্ষ শ্রম ও মেধাবী মানুষকে আকর্ষণ করা।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও শেনজেনকে শক্ত করা

ইইউ এখন তার সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্ত করে তুলছে, নতুন ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সিস্টেম চালু হবে, যার মধ্যে শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশ/প্রস্থান সিস্টেম ও ইউরোপীয় ভ্রমণ তথ্য ও অনুমোদন ব্যবস্থা-‘ইটিআইএএস’ নামের ভ্রমণ অনুমোদন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত।  ইউরোপীয় বর্ডার এজেন্সি (ফ্রনটেক্স)-এর ক্ষমতা ও ভূমিকা উন্নত করা হবে যাতে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হয়।

অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসন আরও কার্যকর করা

বর্তমানে যারা অবৈধ অবস্থায় ইউরোপে থাকার নির্দেশ পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে মাত্র প্রায় একটি চারজনেরই প্রত্যাবাসন কার্যকর হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠতে কমিশন একটি সাধারণ ইউরোপীয় প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা তৈরি করবে। যেখানে, অভ্যন্তরীণ নিয়মাবলি আরও সহজ হবে, ডিজিটাল প্রক্রিয়া ব্যবহার করে রিটার্ন সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে ও ইউরোপীয় “রিটার্ন হাব” গড়ে তোলা হতে পারে যেখানে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা আরও সমন্বিতভাবে করা হবে। 

ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

ইইউ অভিবাসন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য একটি “ইউরোপীয় এআই ফোরাম” গঠন করা হবে, যাতে সদস্য দেশগুলো অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও দ্রুত, নির্ভুল ও নিরাপদ হবে।

২০২৮-২০৩৪ বাজেটে অভিবাসন ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ

ইউরোপীয় কমিশন ইইউর আগামী দীর্ঘমেয়াদি বাজেটে (২০২৮-২০৩৪) অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সর্বমোট প্রায় ৮১ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। এই বিশাল বরাদ্দের একটি বড় অংশই হবে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন ও আসিলাম নীতির বাস্তবায়ন, ইউরোপীয় বৈধ প্রবেশ পথের উন্নয়ন এবং ফ্রনটেক্স ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সংগঠিত কাজকর্মে।

অবৈধ অভিবাসন বনাম বৈধ দক্ষকর্মী

ইইউ তত্ত্বাবধানে আনতে চাইছে, অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয় এমন লোকের সংখ্যা কমানো, পাচারকারীদের ব্যবসা ভেঙে দেওয়া এবং একই সঙ্গে দক্ষ শ্রম ও মেধা যুক্ত করার জন্য ভিসা নীতিকে সহজ ও দ্রুত করা, বিশেষত স্কিলড ও যোগ্য পেশাজীবীদের জন্য। এটির পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ হলো ইউরোপের দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা ও শ্রমঘাটতি, যেখানে দক্ষ বিদেশি কর্মী এবং গবেষকের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। এই নতুন কৌশলটি সেই চাহিদাকে বৈধ পথে পূরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

মানব পাচার ও নিরাপত্তা বিষয়ে ও জোর কৌশল

ইইউ কৌশলপত্রে শুধু ভিসা নয়, মানবপাচার ও ছদ্মপথে অভিবাসন রোধ-এর উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । সমুদ্রপথ বা স্থলপথ দিয়ে যেসব লোক বিপদজনক পথে ইউরোপে আসার চেষ্টা করছেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের নতুন অভিবাসন কৌশল, ‘ইউরোপই ঠিক করবে কে আসবে’, এই নীতিকে সামনে রেখে গঠিত। অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী এবং মেধাবীদের বৈধভাবে ভিসা পেতে সুযোগ বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈধ পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রযুক্তি (এআই ও ডিজিটাল সিস্টেম), বাজেট বরাদ্দ ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ, সবই এর অংশ।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version