অনলাইন জগতের নানা ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর অংশ হিসেবে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং অনলাইন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘নিরাপদ অ্যাকাউন্ট’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েন শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিতে ‘ইইউ কিডস অ্যাক্ট’ নামে নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব ও চ্যাটজিপিটির মতো প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে—এমন উদ্বেগের মধ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হলো। এর আগে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, তুরস্কসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উরসুলা ভন ডার লায়েন বলেন, ‘আমাদের শিশুরা এযাবৎকালের তৈরি সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তির মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তি শিশুদের কল্যাণ বা বিকাশের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত ইইউ কিডস অ্যাক্ট ডিজিটাল বিশ্বেও একটি স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করবে, ঠিক যেমনটি আমরা বাস্তব জীবনে প্রতিদিন করি।’
তবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বিশ্বের প্রথম সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া যেসব বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, ইইউকেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে শিশুদের অ্যাকাউন্ট
আইনে পরিণত হওয়ার আগে আগামী মাসগুলোতে ইইউভুক্ত দেশগুলো ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। অনুমোদন পেলে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলকভাবে অভিভাবকদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গেম, শিশুদের জন্য তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সঙ্গী ও চ্যাটবট পরিচালনায় একগুচ্ছ ‘করণীয় ও বর্জনীয়’ বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।
এসব বিধিনিষেধের মধ্যে থাকবে আসক্তি তৈরি করতে পারে এমন বিভিন্ন ফিচার, ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো সুপারিশ বা রিকমেন্ডেশন ফিড, ইনফিনিট স্ক্রল বা সীমাহীন স্ক্রোলিং এবং পুরস্কারের প্রলোভন দেখানো বিভিন্ন কৌশলের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া অপরিচিত ব্যক্তিদের আগাম অনুমতি ছাড়া শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।
শিশুদের জন্য তৈরি এআই সঙ্গী ও চ্যাটবটের ফিচারগুলো ডিফল্টভাবেই বন্ধ রাখতে হবে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ অ্যালগরিদম তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সহজে ব্লক ও মিউট করার সুবিধাসহ অভিভাবকদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দিতে হবে।
নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় নির্দিষ্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আইন লঙ্ঘন করলে কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক বার্ষিক বিক্রয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি ব্যয় মেটাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকি ফি দিতে হবে।
এদিকে গুগল ও মেটার প্রতিনিধিত্বকারী শীর্ষ প্রযুক্তি লবিং গ্রুপ ‘সিসিআইএ ইউরোপ’ সতর্ক করে বলেছে, প্রস্তাবটি ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইইউর বিদ্যমান অন্যান্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলেও দাবি করেছে।
