ইউরোপে জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলায় কোন কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন করবে, তা স্পষ্ট করতে নতুন আইন আনতে যাচ্ছে ইউরোপীয় কমিশন। মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত নতুন জলবায়ু নীতিমালা ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এতে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রস্তুতি ও নাগরিকদের সুরক্ষায় জাতীয়, আঞ্চলিক নাকি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন করবে, তা নির্ধারণ করে দিতে হবে ইইউভুক্ত দেশগুলোকে।
ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইইউর জলবায়ুবিষয়ক কমিশনার ওপকে হুকস্ট্রা এ তথ্য জানিয়েছেন।ব্রাসেলসের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২১০০ সালের মধ্যে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে ইউরোপকে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবদাহ, দাবানল ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
হুকস্ট্রা সতর্ক করে বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা সাময়িকভাবে কিংবা দীর্ঘ সময়ের জন্য অতিক্রম করার পথে রয়েছে বিশ্ব। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ সফল হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারগুলোকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, “সদস্যদেশগুলো ঠিক করবে, তারা কোন পর্যায়ে এই দায়িত্ব দিতে চায়। তবে আমরা বাধ্যতামূলক করতে চাই, তাদের দায়িত্ব কার ওপর থাকবে, তা নির্ধারণ করতে হবে এবং স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।”
ইইউ একদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যয়ও বাড়ছে। দাবানল ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন থেকে শুরু করে বাড়িঘর, সড়ক ও সরকারি অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে।
হুকস্ট্রার হিসাব অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে চরম আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি।
৩ ডিগ্রি উষ্ণতায় বদলাতে হবে পরিকল্পনা
শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে ইউরোপের মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়তে পারে, এমন প্রশ্নে হুকস্ট্রা শহরগুলোর জন্য তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের উষ্ণ আবহাওয়ার উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, অতীতের আবহাওয়ার ধরনকে ভিত্তি ধরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করলে চলবে না।
ইউরোপীয় কমিশনের এই পূর্বাভাসের ভিত্তি হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) এবং ইউরোপের উন্নত জলবায়ু মডেলিংয়ের গবেষণার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ব্রাসেলসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপ প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইউরোপের সব অঞ্চলে সমান হবে না।
হুকস্ট্রা বলেন, “আমরা সবকিছু ঠিকভাবে করতে পারলেও গত বছরের মতো গ্রীষ্মকাল আরও অনেকবার দেখতে হবে।”
তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি, সহনশীলতা ও আগাম পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রস্তাবিত আইনে নতুন সড়ক, সেতু ও আবাসিক এলাকা নির্মাণের পরিকল্পনায়ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বলা হবে। অতীতের আবহাওয়ার উপযোগী করে তৈরি অবকাঠামো ভবিষ্যতের পরিস্থিতি সামাল দিতে নাও পারে—এমন বাস্তবতা থেকেই এ উদ্যোগ।
ইউরোপীয় কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার বলেন, “ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর তা সামাল দেওয়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই প্রস্তুতি ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই আমরা। কারণ, দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার কাজ প্রায়ই তাৎক্ষণিক ও অপরিকল্পিতভাবে করা হয়। এতে আগের চেয়ে উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সব সময় সম্ভব হয় না।”
নতুন অর্থায়নের ঘোষণা নেই
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কমিশনের নতুন জলবায়ু সহনশীলতা কৌশলে সাধারণ পরিবারকে সহায়তার জন্য নতুন কোনো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি থাকছে না। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পদ সুরক্ষিত করতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বহন করা কঠিন হতে পারে।
হুকস্ট্রা ইইউর বাজেটের ৩৫ শতাংশ জলবায়ু ও প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্যয়ের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন।
তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে ইইউর পরবর্তী সাত বছরের বাজেট নিয়ে চলমান আলোচনার ওপর। জলবায়ু খাতে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও কৃষিতে সহায়তার মতো খাতেও অর্থ বরাদ্দের চাপ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০৩০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) সম্প্রতি ঘোষিত ৩০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার ওপরও নির্ভর করছে কমিশন।
কমিশনারের যুক্তি, আগাম প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। তবে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো কীভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যয় বহন করবে, সে বিষয়ে কোনো নতুন সহায়তা কর্মসূচি বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি।
জলবায়ু বিমার ঘাটতি
জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বিমার ভূমিকা বাড়াতেও বীমা খাতের সঙ্গে কাজ করতে চায় ব্রাসেলস। হুকস্ট্রার মতে, ইউরোপের অনেক অঞ্চলেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষা নেই।
কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সম্পদের মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ বিমার আওতায় রয়েছে। ফলে বড় ধরনের দুর্যোগের পর সরকার ও সম্পত্তির মালিকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হুকস্ট্রা বলেন, “এত বেশি এলাকায় পর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষা না থাকার বিষয়টি” কমিশনের পর্যালোচনার অন্যতম দিক হবে।
নতুন এই কৌশলের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইইউর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর বাস্তবতার ব্যবধানও সামনে আসতে পারে।
