বিশ্বজুড়ে গ্রীষ্মে ১৫০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ তাপের মুখে।নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি গ্রীষ্মে বিশ্বজুড়ে ১৫০ কোটির বেশি মানুষ বিপজ্জনক মাত্রার তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন।
জলবায়ু নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৯ জন এক মাসের সমপরিমাণ সময় ‘ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার’ মধ্যে ছিলেন। এ সময়ে ইউরোপ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ‘অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ’ অঞ্চল।
গবেষকেরা ‘ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রা’ বলতে এমন দিনকে বুঝিয়েছেন, যখন কোনো এলাকার তাপমাত্রা বছরের ওই সময়ের জন্য ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ওই এলাকার ৯০ শতাংশ দিনের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি থাকে। এই পর্যায় থেকে অতিরিক্ত গরমের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে শুরু করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ২০৩টি দেশের গড় একজন মানুষ অন্তত ৩০ দিন ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার মুখে ছিলেন। এর মধ্যে ৫৪টি দেশে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময় ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ।
অস্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে বেশি উষ্ণ ১০টি দেশের মধ্যে সাতটিই ইউরোপের। তালিকার শীর্ষে ছিল ফ্রান্স। দেশটিতে ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
‘যে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই’
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের ক্রিস্টিনা ডাল বলেন, “১০ জনের মধ্যে ৯ জন ইউরোপীয়র ঝুঁকিপূর্ণ তাপ সহ্য করা, এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েক শ কোটি মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা উত্তর আমেরিকায় একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড—সবই দেখাচ্ছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে উষ্ণতা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিরাপদ শারীরিক সীমা অতিক্রম করছে।”
তিনি বলেন, “গত তিন মাস এমন এক সতর্কবার্তা, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির মানবিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাস্তব সময়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে। এগুলো থেকে সরে আসার প্রয়োজনীয়তা এর আগে কখনো এত পরিষ্কার ছিল না।”
গবেষণায় যুক্ত না থাকা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল বলেন, গবেষণাটি দেখিয়েছে—কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ওপর মানবজাতির নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের ‘ক্রমবর্ধমান ব্যয়’ কতটা ভয়াবহ।
তার মতে, সমাধান ‘স্পষ্ট’। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ‘সস্তা ও নিরাপদ’।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কি ইউরোপকে ঠান্ডা করতে পারবে?
ইউরোপের এবারের তীব্র গরম ছিল আরও বড় একটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এ ধরনের তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল।
চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা আর সম্ভব নয়। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রায় ২০০ দেশ এই সীমাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিল।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা এবং অন্যান্য পরিস্থিতিতে ২ ডিগ্রির বেশি উষ্ণতার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির ওপরে ওঠার পর তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আবার কমিয়ে আনা।
উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির ওপরে ওঠার মাত্রা ও সময়কাল যতটা সম্ভব কম ও স্বল্পস্থায়ী রাখতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৩৪ শতাংশ উৎপাদিত হয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৬০–৭০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত মাত্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির ওপরে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হয়।
গত বছর প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নে জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোলারপাওয়ার ইউরোপের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩ হাজার ৩৮০ কোটি ইউরোর গ্যাস আমদানি এড়াতে পেরেছে—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে।
তবে প্রতি বছর পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রেকর্ড ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হলেও বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদার মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে সবুজ জ্বালানি দিয়ে। এ চাহিদা বাড়াচ্ছে বিপুল বিদ্যুৎনির্ভর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ১৭ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ এখন তথ্যকেন্দ্রগুলোতে যায়। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহার দ্বিগুণ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
একই সময়ে ইউরোপের পুরোনো বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে কিংবা গ্রিডের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ব্যাটারি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতে এখনও প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ কম।
