বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কয়েক সপ্তাহের নীরবতা ভেঙে জার্মানির লিপজিগ বিমানবন্দরে গত মাসে হওয়া ব্যর্থ ড্রোন হামলার চেষ্টার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে বার্লিন। এ ঘটনায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলবের পাশাপাশি একটি রুশ কনস্যুলেট বন্ধ এবং দেশটির বিরুদ্ধে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জার্মান সরকার।

মঙ্গলবার জার্মান কর্মকর্তারা জানান, গত ৪ আগস্ট লিপজিগ বিমানবন্দরে ইউক্রেনের একটি পণ্যবাহী বিমানের পাশে সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত শক্তিশালী বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়া যায়।

লিপজিগ বিমানবন্দর ইউরোপ ও ন্যাটোর সামরিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ড্রোনটি বিমানটির ডানায় আঘাত করলেও বিস্ফোরণ ঘটেনি। সেটি পরে মাটিতে পড়ে যায়।

একই দিনের শেষ দিকে আরও একটি ড্রোন অন্য একটি পণ্যবাহী বিমানের সঙ্গে ধাক্কা খায়। জার্মান গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ দিন পর বিমানবন্দরের কাছের একটি মাঠ থেকে সামরিক বিস্ফোরকের আলামতসহ তৃতীয় একটি ড্রোনও উদ্ধার করা হয়।

জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালেকজান্ডার ডোব্রিন্ড বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে সরকার এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থার হয়ে কাজ করা পেশাদারদের মাধ্যমে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

তার দাবি, ড্রোনের গঠন, ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক এবং বিস্ফোরণ ব্যবস্থা রাশিয়ার অন্যান্য হাইব্রিড অভিযানের সঙ্গে মিল রয়েছে।

ডোব্রিন্ড বলেন, হামলার প্রস্তুতিতে উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নিম্নস্তরের এজেন্টদের ওপর।

‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, বিষয়গুলো তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি,’ বলেন তিনি।

তবে জার্মানির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, এত বড় অভিযোগের পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। তার দাবি, জার্মানি এখনো কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি এবং বার্লিন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করার পথ বেছে নিয়েছে।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াদেফুল এই ঘটনাকে ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার ‘আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ শিকলের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের কঠোর অবস্থানে নেতৃত্ব দেওয়া জার্মানিও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকবে না।

ঘটনার জবাবে জার্মানি বন শহরে অবস্থিত রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে বার্লিনের ‘রাশিয়া হাউস’-এর চুক্তিও বাতিল করা হবে।

জার্মান আইনপ্রণেতাদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘রাশিয়া হাউস’ রুশ গোয়েন্দা তৎপরতার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এ ছাড়া জার্মানিতে রাশিয়ান নাগরিকদের প্রবেশের নিয়ম আরও কঠোর করা এবং রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজ বহরের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বার্লিন।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনের জন্য এসব জাহাজ প্রায়ই অন্য দেশের পতাকা ব্যবহার, নাম পরিবর্তন এবং জিপিএস ট্র্যাকিং বিভ্রান্ত করার মতো কৌশল ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।এদিকে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জার্মানির অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন অজুহাত’ বলে দাবি করেছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বার্লিন একটি অজুহাত তৈরি করেছে এবং মস্কো এর উপযুক্ত জবাব দেবে।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মারৎসও হামলার ঘটনায় রাশিয়ার নাম প্রকাশ্যে আনার জন্য নিজ দল ও আইনপ্রণেতাদের চাপের মুখে ছিলেন।

ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থন দুর্বল করতে মস্কো ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বাড়াচ্ছে—এমন উদ্বেগও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

গত এক মাসে ইতালি, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া ও স্লোভাকিয়ায় ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সরবরাহ দেওয়া অস্ত্র কারখানাগুলোতে রহস্যজনক বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডোব্রিন্ড বলেন, জার্মানি ভবিষ্যতেও রাশিয়ার আরও হাইব্রিড হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা করছে।

তার ভাষায়, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে এ ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতি রাশিয়ার রয়েছে।

তবে জার্মান সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন দেশটির কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

জার্মানির ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক আর্নড ফ্রেটাগ ফন লরিংহোভেন বলেন, ঘোষিত পদক্ষেপগুলো ‘মোটেও যথেষ্ট নয়’।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক চিফ অব স্টাফ নিকো লাঙ্গেও বলেন, এটি সর্বোচ্চ একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে। তার মতে, রাশিয়াকে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে আরও শক্ত বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।এদিকে মঙ্গলবার জার্মানির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন পশ্চিমা নেতারা।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, লিপজিগে কথিত রুশ হাইব্রিড হামলার ঘটনায় ন্যাটো জার্মানির সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে।জার্মানির ঘোষিত পাল্টা পদক্ষেপকেও স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version