শনিবার, ২৪ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন ঘিরে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ফ্রান্সে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

মার্সেই ও লিওঁ শহরে শনিবার ও রোববার সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ বাড়ানোর পাশাপাশি আংশিক কারফিউর মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। শনিবার ল্যুভ, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার প্যারিসে এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সহিংসতা ও লুটপাটের উসকানি ছড়ানো হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দেশজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়ে ডিফেন্স কাউন্সিলের জরুরি বৈঠক করেছেন। অস্থিরতার কারণে চলতি মাসের শেষ দিকে নাইজেরিয়া ও সেনেগালে তাঁর নির্ধারিত সফরও স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে অবকাঠামোগত সমস্যা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে মাখোঁর।

গত সপ্তাহে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ পরিস্থিতিতে ফ্রান্সে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। বৃহস্পতিবার দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটিতে সহিংসতা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বিক্ষোভ ও অস্থিরতাপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পাশাপাশি আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে মার্কিন নাগরিকদের। রোববার ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) খেলা দেখতে যাঁরা প্যারিসে যাবেন, তাঁদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ফ্রান্সের যেসব এলাকায় বিক্ষোভ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেখানে শনিবার শুধু অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মাখোঁ।

গত সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত ২১৭ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানান। তিনি জানান, দেশজুড়ে দুই হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। লে ফিগারো পত্রিকার বরাতে তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকেরই আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকার কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত এসব এলাকায় চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে।

সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার মার্সেইয়ে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে শহরটিতে ৫০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এ ছাড়া রুয়াঁ, নিস, তুলোঁ ও গ্রেনোবলসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ ও জনসমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে শনিবারের জাতীয় বিক্ষোভের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন মাখোঁ।

মাখোঁ বলেছেন, সাধারণভাবে বিক্ষোভ না করাই এখন কাম্য। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা করবে। শ্রমিক সংগঠনের বাইরে অন্যদের আয়োজিত বিক্ষোভ সম্ভব হলে নিষিদ্ধ করা হবে বলেও জানান তিনি।

বামপন্থি কট্টর গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও তুলেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

গত ১৭ অক্টোবর জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। শ্রমিক সংগঠন, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর সমর্থনে প্যারিসসহ বিভিন্ন বড় শহরে মিছিল হয়। অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে সহিংসতা ও লুটপাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version