ফ্রান্সে চলতি সপ্তাহান্তের সহিংস বিক্ষোভ ও দাঙ্গা দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে আবারও সামনে এনেছে। ২০১৭ সালে পরিবর্তন ও প্রত্যাশার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের মূল সুরই ছিল ‘বিপ্লব’। কিন্তু প্রায় এক দশক পর ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লো পেনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ব্রেক্সিট এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময় পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লো পেনকে পরাজিত করেছিলেন মাখোঁ। তখন তাঁর পরিবর্তনের অঙ্গীকারে আশাবাদী হয়ে লন্ডনে বসবাসরত অনেক ফরাসি পরিবারকে দেশে ফিরে যেতে দেখেছিলেন এক সাংবাদিক। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, মাখোঁর নেতৃত্বে ফ্রান্স নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথে এগোবে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাখোঁ হয়তো একটি বিপ্লবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তবে সেটি তাঁর প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের বিপ্লব নয়। বরং তাঁর শাসনামলে জমে ওঠা অসন্তোষ কট্টর ডানপন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ আরও প্রশস্ত করতে পারে।
জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ মাখোঁর বিরুদ্ধে
মাখোঁ যে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন, তার ইঙ্গিত আগেই পাওয়া গিয়েছিল। চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে হাজারো উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী রাস্তায় নামলেও সে সময় তিনি ব্রিটানির উপকূলের কাছে একটি যুদ্ধজাহাজে সময় কাটান।
সহকর্মী মার্ক ল্যান্ডলারের বরাত দিয়ে এক সাংবাদিক জানান, মাখোঁ সেখানে ফ্রান্সের পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি সাবমেরিন থেকে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ দেখছিলেন। এদিকে, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর।
এরপর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। রোববার জনসমক্ষে এসে বক্তব্য দিলেও ততক্ষণে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংস রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অন্যরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দাঙ্গা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা শুরু হয়। সহিংসতা শুরুর আগেই মাখোঁর প্রতি জনসমর্থন নেমে এসেছিল মাত্র ১৫ শতাংশে।
অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি
২০১৭ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে মাখোঁ ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান এবং অকার্যকর সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সাবেক বিনিয়োগ ব্যাংকার ও মধ্য-বামপন্থী সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী মাখোঁ নিজেকে প্রচলিত বাম ও ডানপন্থী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে ফ্রান্সকে ঐক্যবদ্ধ করা, যাতে ভোটারদের কট্টর ডানপন্থীদের দিকে ঝুঁকতে না হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মাখোঁর অবস্থান ছিল মুক্তবাজারপন্থী। তাঁর যুক্তি ছিল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সহজ ও সাশ্রয়ী করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এতে কট্টর ডানপন্থীদের প্রতি ঝুঁকে পড়া ভোটারদেরও সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব হবে।
গত নয় বছরে করপোরেট কর ও আয়কর কমিয়েছেন মাখোঁ। সম্পদের ওপর আরোপিত করও বাতিল করেছেন। কিন্তু এসব পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। কমেনি সরকারি ঋণের বোঝাও।
করছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি ইউরো কমছে। এরই মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ অনেক বেড়েছে। ফলে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও সরকারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী বছর সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ফ্রান্সের করদাতাদের যে অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে, তা প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। যদিও এসব সমস্যার অনেকগুলোই মাখোঁ ক্ষমতায় আসার আগ থেকেই ছিল, কোভিড-১৯ মহামারির মতো ঘটনাও সংকট আরও বাড়িয়েছে।
দাঙ্গায় স্পষ্ট মাখোঁর শাসনের সীমাবদ্ধতা
ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। তবে চলতি সপ্তাহান্তের সহিংসতা ছিল ব্যতিক্রমী। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিক্ষোভের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফরাসি রাষ্ট্রের পরিচয় বহনকারী বেশ কয়েকটি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।
এই বিক্ষোভ দেখিয়েছে, মাখোঁর প্রায় এক দশকের শাসনামলেও ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে রাজনৈতিক বিভাজন ও জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ।
এ অবস্থায় মাখোঁর বিরোধী কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লো পেনের রাজনৈতিক সম্ভাবনা বাড়ছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে তিনি আগে থেকেই এগিয়ে ছিলেন। সাম্প্রতিক দাঙ্গার পর তাঁর দল ন্যাশনাল র্যালি দ্রুত পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় লো পেনের দল
মাখোঁর সরকার ও কট্টর বামপন্থীরা যখন দাঙ্গার জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে, তখন ন্যাশনাল র্যালি নির্বাচনী প্রচারে নেমেছে।
দলটির সভাপতি জর্ডান বারদেলা বলেন, ‘মানুষের এখন জেগে ওঠা দরকার। তাদের সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রস্তুত।’
রোববার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় লো পেন ফ্রান্সকে বিভক্ত একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরেন। ভিডিওতে তাঁকে ফ্রান্সের পতাকার সামনে কাঠের টেবিলের পেছনে বসে থাকতে দেখা যায়। দৃশ্যটি দেখে এক সাংবাদিকের সহকর্মীর মন্তব্য ছিল, মনে হচ্ছিল লো পেন যেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
একসময় মাখোঁর বয়স, আত্মবিশ্বাস ও পরিবর্তনের বার্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হতো। ওবামার মতো মাখোঁও আশার বার্তা দিয়ে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর বিরোধীরা এখন তাঁকে অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন। তাঁর কথাবার্তা ও আচরণেও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ও উদ্বেগ থেকে দূরত্বের ছাপ খুঁজে পান অনেকে।
মাখোঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, তা নির্ভর করবে তাঁর বিদায়ের পর ফ্রান্সের নেতৃত্ব কে গ্রহণ করছেন, তার ওপরও। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যে কট্টর ডানপন্থীদের ঠেকাতে তিনি রাজনীতিতে নেমেছিলেন, তাঁর শাসনামলের সংকটই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
