বুধবার, ৭ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাবাজেটে ঘাটতি, শিক্ষক ও কর্মী সংকট এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী প্যারিসের একটি হাইস্কুলে শিক্ষক বিক্ষোভের সমর্থনে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

ক্লাস বর্জন করে দেশটির বিভিন্ন শহরের হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশি বলপ্রয়োগ, জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান আয়োজক মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ইউনিয়ন সিঁদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) জানিয়েছে, ফ্রান্সজুড়ে ২ হাজার হাইস্কুল বন্ধ রয়েছে। দেশটির সব বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন ‘সংগঠিত করেছে’ বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

তবে স্কুল বন্ধের সংখ্যা নিয়ে ইউনিয়নের তথ্যের সঙ্গে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮৯১টি স্কুলে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ রয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার প্যারিস বাদে দেশজুড়ে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও বামপন্থী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও এতে যোগ দেন।

দেশটির বিভিন্ন এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেনে শহরে বিক্ষোভের সময় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এএফপির ছবিতে বিক্ষোভকারীদের ছাতা দিয়ে জলকামান থেকে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

মার্সেইয়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। দিনভর হাজারো মানুষ শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন। প্যারিসেও বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

এদিকে মঙ্গলবার প্যারিসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যোগ দেন বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। তার উপস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তারা ‘মেলঁশোঁ প্রেসিডেন্ট’ বলে স্লোগান দেন।

মেলঁশোঁ বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই)-এর প্রবীণ নেতা। তরুণ বামপন্থীদের মধ্যে তিনি বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন বিক্ষোভস্থলে তার উপস্থিতিতে তাকে একনজর দেখতে মানুষের ভিড়ও দেখা যায়।

শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন মেলঁশোঁ। তবে সরকার তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বার্থে অশান্তি উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেশজুড়ে শত শত পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার বিকেলে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে লেকর্নু বলেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ২১৫ জন শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

সহিংসতাকে ‘স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখানোর’ প্রবণতার নিন্দা করে তিনি বলেন, এটি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’।

লেকর্নু বলেন, ‘কোনো হাইস্কুল পুড়িয়ে দেশের হাইস্কুল ভবনগুলোর অবস্থার উন্নতি হয় না। একজন শিক্ষককে গণপিটুনি দিলে শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে কোনো সহায়তা হয় না।’

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকার ‘পুলিশি দমন-পীড়নের’ নির্দেশ দিয়েছে—এমন দাবিও নাকচ করেন তিনি। তার ভাষায়, এ ধরনের দাবি পুরোপুরি ‘মিথ্যা’।

এর আগে সোমবার উত্তর ফ্রান্সে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, স্ট্রাসবার্গ, ট্যুরস ও লিলের মতো শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version