বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬   |   ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতারা ‘স্টুপিড’ বা নির্বোধ মন্তব্য করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। এদিকে, চলতি সপ্তাহান্তে দেশটিতে আরও বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে।

কাতার সফরের সময় মাখোঁ নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, গত শনিবারের দাঙ্গার পর তথ্য নিয়ে কারসাজি করে অনেকেই এমন মন্তব্য করেছেন, যা একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য ও নির্বোধ। এসব মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে মাখোঁ বলেন, ‘অন্যদের মধ্যে তিনিও রয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নিজের রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে প্রচার চালানোর সময় ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য ‘অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের’ দায়ী করেছেন ট্রাম্প।
দোহার সাংবাদিকদের মাখোঁ বলেন, ‘এ অঞ্চলে কিংবা আটলান্টিকের অন্য পারে—নির্বাচনী প্রচারে থাকা কিছু নেতা সরলভাবে এমন সব বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যেগুলো নির্দিষ্ট কিছু মহল স্পষ্টতই ছড়াতে চাইছে।’

ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, এসব নেতা নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারের স্বার্থে ফ্রান্সকে ব্যবহার করছেন। ‘আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আমাদের এমনিতেই মোকাবিলা করার মতো অনেক সমস্যা রয়েছে।’
মাখোঁ আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এমন কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে ফ্রান্সে কখনো ঘটেনি—এমন ঘটনার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘কেউ কেউ দাবি করেছেন, অভিবাসী ও ইসলামপন্থীদের বিশাল ঢল আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও দাবি করেছেন, ফ্রান্স ‘চরমপন্থী ইসলামের আগ্রাসনের’ শিকার হয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে ইসরায়েলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে বিশ্লেষকেরা ফ্রান্সের বিক্ষোভের জন্য অভিবাসীদের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করার দাবিগুলো নাকচ করেছেন।
নিজের উত্তরসূরি নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে শুরু হওয়া এই সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মাখোঁ ও তাঁর সরকার। গত শনিবার দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক দাঙ্গার সময় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে স্বীকার করেছে সরকার।

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভের বেশির ভাগই ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে দ্রুতই তা সহিংসতা ও ব্যাপক লুটপাটে রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ ও লিমোজ শহরে পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর হয়ে ওঠে। লিমোজে পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হলে ভবনটির একাংশ ধ্বংস হয়ে যায়।


নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এর আওতায় রয়েছে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্রাসাদ, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এবং ল্যুভর জাদুঘর ও শঁজেলিজের মতো জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।

এ ছাড়া বাস্তিল ও রেপুবলিক স্কয়ার এবং শাতলে-লে-আল শপিং এলাকাতেও সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে এসব এলাকার মধ্যে শাতলে-লে-আলে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছিল দুষ্কৃতকারীরা।
অস্থিরতার জেরে কয়েকটি দেশ ফ্রান্সে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে আর্থিক বাজারেও। বুধবার ফরাসি সরকারের ১০ বছর মেয়াদি বেঞ্চমার্ক বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।

গত সপ্তাহান্তের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর অঙ্গীকার করেছেন মাখোঁ। তবে এরই মধ্যে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ নামে পরিচিত তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনকারীরা শনিবার প্যারিসের কেন্দ্রস্থল দিয়ে মিছিল করার পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছেন। এ মিছিল সরকারের জন্য নতুন বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষায় আরও বিনিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনও একই দিনে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া দেশব্যাপী আন্দোলন আবারও জোরদার করতে চাইছেন।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version