ক্ষমতায় গেলে ছোট নৌকায় করে অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের রুখতে ইংলিশ চ্যানেলে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান’ পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যের উগ্র ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’। গত সোমবার (৩ আগস্ট) এই প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফ্রান্স।
এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতা ও ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম প্রচারক নাইজেল ফারাজ ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি বা রাজকীয় নৌবাহিনীকে নিয়োজিত করে অভিবাসীদের ছোট নৌকাগুলো ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর একটি নীতি উন্মোচন করেন। তবে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছে, এই পরিকল্পনাটি ‘ফরাসি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘনের পাশাপাশি সমুদ্র আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে।’
মরক্কো থেকে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক প্রবেশের কয়েক দিন পরই এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি এল, যা ইউরোপে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
নতুন নীতিমালার বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফারাজ বলেন, ‘গত সপ্তাহান্তে সেউতায় যা ঘটেছে, তা পরিস্থিতি কতটা গুরুতর তা প্রমাণ করে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ফারাজ লিখেছেন, ‘মানবিক মিশনগুলো সমুদ্র আইন বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে না’ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ‘এটি পছন্দ করুন বা না করুন’, তাঁদের দল ‘ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় অনড় থাকবে’ বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
এই উগ্র ডানপন্থী দলটির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে তাদের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হতে হবে, যা ২০২৯ সালের আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নয়। এমন এক সময়ে এই প্রস্তাব এল যখন ফারাজ ও তাঁর দল বেশ কিছু আর্থিক কেলেঙ্কারি ও সরকারি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছে। অথচ গত ১৮ মাস ধরে তারা জাতীয় জরিপে বেশ এগিয়ে ছিল, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
সর্বশেষ কেলেঙ্কারিতে, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার গত সোমবার জানিয়েছেন যে তিনি গত সপ্তাহে দলটির উপনেতা রিচার্ড টাইসের বিরুদ্ধে আর্থিক স্বার্থের ‘ঘোষণা দিতে ব্যর্থতার’ অভিযোগে একটি তদন্ত শুরু করেছেন।
কমিশনার ইতিমধ্যেই ফারাজের বিরুদ্ধে আরেকটি সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করছিলেন। তবে পরের সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ফারাজ সংসদ সদস্য (এমপি) পদ থেকে পদত্যাগ করার পর সেই তদন্তটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে রিফর্ম ইউকে-কে দেওয়া অনুদানের বিষয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন পুলিশ একটি তদন্ত শুরু করেছে বলে নিশ্চিত করেছে।
তবে ফারাজ এই ঘোষণাকে কোনো রাজনৈতিক নাটক বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হিসেবে অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে রিফর্ম ইউকে ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে’ এই নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেবে।
দলটির স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ জোর দিয়ে বলেন, ফ্রান্সের যেকোনো ধরনের প্রতিরোধ ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি এলিসি প্যালেস (ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) অস্বীকৃতি জানায়, তবে নিশ্চিত থাকুন: রয়্যাল মেরিনসের সৈন্যরা তাঁদের নিরাপদে সেই তীরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে যেখান থেকে তাঁরা সকালে রওনা হয়েছিলেন।’ তাঁর মতে, এই পরিকল্পনাটি হবে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংলিশ চ্যানেলে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।’
তবে রয়্যাল নেভির সাবেক কমান্ডার টম শার্প এএফপি-কে বলেন, নৌবাহিনী মোতায়েন করা ‘প্রকৃত কোনো সমাধান নয়। নৌবাহিনী অনেক কিছুই করতে পারে, তবে ফরাসিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে মানুষকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর ধারণাটি আমার কাছে কোনো যুক্তিযুক্ত সমাধান বলে মনে হয় না।’
এর আগে ২০২০ সালে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার এই ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিল এবং দ্রুতই তা বাতিল করে দিয়েছিল।
দুই সপ্তাহ আগে কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়া প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম গত রবিবার অভিবাসীদের পারাপার রোধে ‘কঠোর ও আপসহীন’ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কেন্দ্র-বামপন্থী লেবার দল এই মানব পাচারকারী চক্রগুলোকে ‘ধ্বংস’ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে ফ্রান্সের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি অন্যতম।
গত এপ্রিলে, লন্ডন ও প্যারিস অভিবাসী পারাপার ঠেকাতে একটি তিন বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার অধীনে ফরাসি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে ৭৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরো দিতে সম্মত হয় যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ সরকার দাবি করছে যে এই কৌশলটি বেশ ভালো কাজ করছে। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ছোট নৌকায় করে অভিবাসীদের আসার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ শতাংশেরও বেশি কমে ১৪,০০০-এ দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক
সপ্তাহগুলোতে আবার এর হার বেড়েছে, বিশেষ করে গত ২৯ জুলাই এক দিনেই রেকর্ড ৭৫২ জন অভিবাসী সেখানে এসে পৌঁছেছেন।
ল্য মোদঁ
