শনিবার, ২৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতালির তাসকানা প্রদেশে অবস্থিত লিভোর্নো বন্দরে আজ অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জাতীয় সীমান্ত রক্ষা ও মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যে চলমান বূমধ্যসাগর অভিযান থেকে উদ্ধার করা ১৪৭ জন অভিবাসীকে নিয়ে একটি এনজিও জাহাজ ‘ওশান ভাইকিং’ নোঙর করার কথা রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের নাগরিক, যার ফলেই এই সংকট আন্তর্জাতিক মাপের দেখাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা, সবকিছুর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

জাহাজটি ওইসব অভিবাসীকে দুইটি ভিন্ন উদ্ধার অভিযান থেকে নিয়ে আসছে, যা সম্প্রতি সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকা ক্ষতিগ্রস্ত নৌকাগুলোর কাছাকাছি চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক, ১০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক, এছাড়া রয়েছে পাকিস্তানের ২০ জন, মিশরীয় ১৩ জন, এথিওপিয়ার ২ জন, সোমালিয়ার ২ জন, এবং এরিত্রিয়ার ১ জন। এই তালিকায় কিছু অবিকল বা অপ্রাপ্তবয়স্ক (অনুসঙ্গীহীন) ১৭ জনও রয়েছে, যারা মূল সরানো কাজের অংশ হিসেবে আলাদা নেওয়া হবে।

ওশান ভাইকিং জাহাজটি যিনি পরিচালনা করেন তিনি এক ইউরোপ ভিত্তিক মানবিক সংগঠন, এসওএস ভূমধ্যসাগর, যার লক্ষ্য ভূমধ্যসাগরে ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জীবন বাঁচানো। এই সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে বিপজ্জনক নৌকা বা দিঙি থেকে মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ বন্দরে পৌঁছানো যায়।

এই উদ্ধার অভিযানগুলো ইতালির প্রিফেকচার বা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়। প্রশাসনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই লিভোর্নো প্রিফেকচারে একটি কোঅর্ডিনেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অভিবাসী স্বীকৃতি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচয় চিহ্নিতকরণ, এবং পরে সঠিক আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বিতরণ সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হয়েছে। সাধারণত, যেখানে অনুসঙ্গীহীন ছোটদের জন্য আলাদা পরিবেশ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, সেখানে বড়রা টাসকানার বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া “অ্যাকোডেশন সেন্টার” বা অভিবাসীদের জায়গা করা কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

এই ধরনের উদ্ধার অভিযানে অভিবাসীদের মুখোমুখি হতে হয় “লিবিয়া-ইউরোপ” রুটের বিপদগুলোতে, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরের মধ্যভাগে যেখানে অভিবাসী নৌকাগুলো প্রায়ই বাজে পরিস্থিতিতে অবস্থান করে। সমুদ্রের মাঝারি ও উচ্চ ঢেউ, অপর্যাপ্ত খাবার, পানি ও ত্রাণের অভাব, এই সব মিলিয়ে বহুবার অভিবাসীর প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে লিবিয়ার উপকূলে একটি নৌকা ডুবে কমপক্ষে প্রায় ৫০ অভিবাসী মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা এই বিপজ্জনক যাত্রার প্রকৃতি তুলে ধরে।

এই উদ্ধার অভিযানগুলোতে প্রাপ্ত অভিবাসীদের ইতালিতে নোঙর করার পর সাধারণত মেডিক্যাল স্ক্রিনিং, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় স্বাস্থ্য এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সাহায্য নেয়া হয়। যাদের শরীরিক অসুস্থতা বা নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন, তাদের প্রথমে গ্রহণ করে চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া, বহু ক্ষেত্রে অনিয়মিত অভিবাসন, মানুষের চুক্তি বা মানবপাচার সম্পর্কিত আইনি তদন্তও চালানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঝুঁকি কমানো যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেহেতু অধিকাংশ উদ্ধারকৃতই বাংলাদেশি, তাই ইতালিতে আসার পর সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা হয় এমন ব্যক্তিদের আইডেন্টিটি, তাদের আবেদনের ভিত্তি বা দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করার উদ্দেশ্যে। অনেকেই অভিবাসনের জন্য সাগর পথে ইউরোপে আসার পথ বেছে নেন এক উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়, কিন্তু যাত্রাপথের বিপদ ও ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এই ধরনের উদ্ধার সফল হলেও পরবর্তী পদক্ষেপগুলো সমন্বিত প্রশাসনিক, মানবিক, আইনি উদ্যোগের পরিবর্তনশীলতার ওপর নির্ভর করে।

সমগ্র ঘটনা আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার এবং ইউরোপীয় অভিবাসন নীতির প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতালি নিজেই ইতোমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ডিবেটে অভিবাসন-বিষয়ক নীতিতে পরিবর্তন করেছে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা ও দায়িত্ব ভাগাভাগি একটি বড় অংশ। যদিও এই অবস্থায় উদ্ধার ও নোঙর করাকে মানবিক সাফল্য বলা হয়, এর পাশাপাশি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, সমন্বয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তির মতো বহু বিষয় নীতি‑পরিকল্পনা পর্যায়েও গুরুত্ব পায়।

এই ওশান ভাইকিং জাহাজের ১৪৭ জন উদ্ধারকৃত অভিবাসীকে নিয়ে আজ লিভোর্নো বন্দরে নোঙর, তা শুধু একটি জাহাজের গন্তব্য নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানুষের জীবন রক্ষাকারী, মানবিক সহায়তা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং অভিবাসন ও ইউরোপীয় নীতির জটিলতার এক নজিরবহুল উপলক্ষও বটে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version