বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬   |   ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে ট্রাকচালকদের অবরোধে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে তাজা খাবার। এমনকি দুটি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইতালি সরকার। অবরোধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারাদণ্ডও হতে পারে।

বুধবার (তারিখ উল্লেখ নেই) ইতালির ব্যবসামন্ত্রী আদলফো উরসো বলেন, কর্তৃপক্ষ অবরোধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করছে এবং সড়ক থেকে অবরোধ সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ‘শুধু ট্রাক চলাচল বন্ধ রেখে গাড়ি চলতে দিলেও তা সড়ক অবরোধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে কারাদণ্ডসহ ফৌজদারি শাস্তি হতে পারে।’

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পুলিশ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩৯ জনকে শনাক্ত করেছে, ৭১ জনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে এবং ২৪২টি প্রশাসনিক জরিমানা করেছে।

পণ্য পরিবহন সচল রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাকের সঙ্গে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থাও করেছে। শুধু দক্ষিণাঞ্চলের কাম্পানিয়া অঞ্চলে ৫০০টি ট্রাককে এ নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইতালির পরিবহন কোম্পানি, কৃষক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা চাপে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

পেট্রল ও ডিজেলের দামে নমনীয় সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আইনপ্রণেতারা আলোচনা করছেন। প্রচলিত ফিলিং স্টেশনের বাইরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি সরবরাহ করা জ্বালানিও এ প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারে।

প্রস্তাবটি বৃহত্তর জ্বালানিসংক্রান্ত একটি ডিক্রির অংশ। ডিক্রিটি ইতালির সিনেটে পাস হয়েছে এবং এখন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিবেচনাধীন।

পরিবহন খাতের আর্থিক চাপ কমাতে ১০০ কোটি ইউরোর বেশি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন উরসো। এর মধ্যে ডিজেলের বাড়তি দামের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪৩ কোটি ৪৮ লাখ ইউরো। এ ছাড়া গাড়িবহর আধুনিকায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় ৫৯ কোটি ইউরো দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও অবরোধ চলছে। জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঠেকানো এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুপারমার্কেটে পণ্যসংকট, নষ্ট হচ্ছে তাজা খাবার
ট্রাকচালকদের অবরোধের প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ ইতালির মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সড়কে বাধার কারণে দোকান ও বিতরণকেন্দ্রে পণ্য পৌঁছাতে পারছে না। উৎপাদনস্থলে আটকে পড়ছে ফল ও দুধের মতো পচনশীল পণ্য।

কৃষিমন্ত্রী ফ্রানচেস্কো লোলোব্রিজিদা বুধবার বলেন, ‘আমাদের ইতালির অচলাবস্থা কাটাতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন এবং নাগরিকেরা সেগুলো কিনতে পারেন।’
বিক্ষোভের কয়েকজন আয়োজকের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির পটভূমি আরও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোতে সংকট বাড়ার আশঙ্কা
অবরোধের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন নেপলস ও বারির মেয়ররা। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে শহর দুটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।

এক যৌথ বিবৃতিতে নেপলসের মেয়র গায়েতানো মানফ্রেদি ও বারির মেয়র ভিতো লেচ্চেসে বলেন, ‘দক্ষিণ ইতালির শহরগুলোর পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংকটজনক। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তাঁরা জানান, খাদ্যপণ্য বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারায় সুপারমার্কেটের তাক ক্রমেই খালি হয়ে যাচ্ছে। বর্জ্য সংগ্রহ ও গণপরিবহন সেবাও বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে রাস্তায় আবর্জনা জমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৭ তারিখে নির্ধারিত বৈঠক এগিয়ে আনার জন্য পরিবহনমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। শহরগুলোর পক্ষে এত দিন অপেক্ষা করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন মেয়ররা।

দুই বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের জ্বালানিসংকট
সড়ক ও সুপারমার্কেটের বাইরে বিমান চলাচলেও প্রভাব ফেলেছে অবরোধ। দক্ষিণ ইতালির কালাব্রিয়া অঞ্চলের ক্রোতোনে ও রেজ্জো কালাব্রিয়া বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিমান চলাচলসংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। উড়োজাহাজগুলোকে যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে অন্য বিমানবন্দর থেকে জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে লামেজিয়া তেরমে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে কাম্পানিয়া অঞ্চলে নতুন করে সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। মিলান-নেপলস সংযোগকারী এ১ এবং কাসের্তা-সালেরনো সংযোগকারী এ৩০ মহাসড়কের কয়েকটি অংশে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ সৃষ্টি করায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এতে দক্ষিণ ইতালির অন্যতম প্রধান পরিবহন করিডরে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি পরিবহন খাতের
ইতালির প্রধান সড়কপণ্য পরিবহন সংগঠনগুলোও অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, যে পরিবহন খাতের স্বার্থ রক্ষায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, অব্যাহত অবরোধ এখন সেই খাতেরই ক্ষতি করছে।

পরিবহনমন্ত্রী সালভিনির সঙ্গে আলোচনার পর সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসিকে অবরোধ সরাতে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।

তাঁদের যুক্তি, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় মোকাবিলায় সরকার পরিবহন কোম্পানিগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে সম্মত হওয়ার পরও অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

সালভিনি জানিয়েছেন, পরিবহন খাতের জন্য ১০০ কোটি ইউরোর বেশি সহায়তা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির বাড়তি দাম সামাল দিতে প্রায় ৪৮ কোটি ইউরো এবং গাড়িবহর আধুনিকায়নে ৫০ কোটির বেশি ইউরো রয়েছে।

জ্বালানিসংক্রান্ত আর্থিক সহায়তার জন্য ইতিমধ্যে ৩২ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। সরকার জানিয়েছে, অর্থ পরিশোধও শুরু হয়েছে।

তবে অবরোধ অব্যাহত থাকায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চাপে পড়ায় দক্ষিণ ইতালিতে স্বাভাবিক পরিবহনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version