ইতালিতে বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাস্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুমোদন করেছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। এতে বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় অংশ নেওয়াকে নতুন অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাদের অভিভাবকদেরও ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ দিকে উত্তর ইতালির কয়েকটি শহরে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব শহরের মধ্যে দেশটির অর্থনৈতিক কেন্দ্র মিলানও রয়েছে। সেখানে তরুণদের কয়েকটি দল দোকানের জানালা ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলোনি বলেন, ‘ভাঙচুর করা ও চুরি করার মধ্যে নতুন কিছু নেই। ভাঙচুর ও চুরি প্রতিবাদ নয়, এগুলো অপরাধ।’
নতুন নিয়মগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। এর আওতায় অন্তত পাঁচজনের কোনো দলের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে কেউ জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করলে তার সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউরো জরিমানাও করা যেতে পারে।
বিক্ষোভের সময় মুখ ঢেকে রাখা কিংবা হামলায় কেউ আহত হলে শাস্তি আরও বাড়তে পারে। ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে কর্তৃপক্ষ। কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাঙচুর বা লুটপাটে জড়িত হলে সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তার অভিভাবকদের।
নতুন নিয়মে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের অপরাধ সংঘটনের আগেই আটক করার ক্ষমতা পাবে পুলিশ। তবে সংশ্লিষ্ট কিশোরের বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আশঙ্কার প্রমাণ থাকতে হবে। আগে এ ধরনের ক্ষমতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
শনিবারের পরিকল্পিত বিক্ষোভে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইতালির কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে মিলানে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ৫০০ সদস্য মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সহায়তা করবে। পাশাপাশি সংবেদনশীল স্থানগুলোতে নজরদারি ও পুরো এলাকার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হবে।
উত্তর ইতালির সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রতিবেশী ফ্রান্সের বিক্ষোভের মিল রয়েছে। শনিবার ফ্রান্সে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। গত কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে এটি ছিল সবচেয়ে সহিংস অস্থিরতার ঘটনাগুলোর একটি।
২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে মেলোনি সরকার। তবে সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপে অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার পেছনের মূল কারণগুলো দূর করার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ইতালির কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ সময়ে বন্দির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার।
এদিকে দক্ষিণ ইতালিতেও বিক্ষোভের মুখে পড়েছে সরকার। ডিজেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ট্রাকচালকেরা সড়ক অবরোধ করছেন। এতে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে কিছু পাস্তা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। কৃষি খাতের বিভিন্ন সংগঠন সতর্ক করেছে, পণ্য পরিবহনে বাধা অব্যাহত থাকলে ফল ও সবজি পচে নষ্ট হতে পারে।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর সড়কপথে পণ্য পরিবহনকারীদের নতুন করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। উত্তর ও দক্ষিণ ইতালির বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
২০২৭ সালে ইতালিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দেশজুড়ে বিক্ষোভ মেলোনি সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার মেলোনি বলেন, ‘আমরা জানি, চাকরি খোঁজা, প্রয়োজনের তুলনায় কম বেতন পাওয়া এবং ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাবনা না দেখার অভিজ্ঞতা কেমন। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিকে কখনোই সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’
