বৃহস্পতিবার, ২৭ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। নেপাল পুলিশ ও দেশটির পর্যটন বোর্ডের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। প্রবল স্রোতে সড়ক, বাড়িঘর, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার পানির তীব্র স্রোতে মানুষ ভেসে যাচ্ছেন। চীনের সীমান্ত এলাকায় ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিশাল কাদামাটি, পাথর ও পানির স্রোত ধেয়ে আসার মুহূর্তে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৬১ জন নেপালি এবং ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। বিদেশিরা ২৬টি দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন।

পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের বেশিরভাগই ভারত ও নেপাল সীমান্তসংলগ্ন মানসসরোবরের পথে থাকা পর্যটক। এর আগে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন।

ভূমিকম্পের পরই বন্যা

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর বরফ ও পাথরের ধস থেকে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসও (জিএফজেড) সিসিটিভি ফুটেজে দেখা সময়ের কয়েক মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করার কথা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিআইএমওডির প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্ত নদীতে বিপুল পরিমাণ পাথর ও ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকায় সেখানে ফের বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

নেপালের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় এখন পর্যন্ত ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নামানো হয়েছে সেনা-পুলিশ

বন্যার প্রবল স্রোতে নেপালের রাসুয়া জেলার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানির তীব্র স্রোতের কারণে সেখানে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও অবতরণ করতে পারছে না। স্থানীয় কর্মকর্তারা নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে।

এদিকে বন্যার পানি নেপালের নদী হয়ে ভারতে প্রবেশ করায় দেশটির উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চীনের গাইরং বন্দরেও ব্যাপক ক্ষতি

নেপাল সীমান্তসংলগ্ন তিব্বতের শিগাতসে অঞ্চলের গাইরং বন্দরে ভূমিধসে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া।

চীন ইতোমধ্যে ৫৭৪ জন উদ্ধারকারী পাঠিয়েছে। তবে সড়কে প্রায় পাঁচ ফুট গভীর কাদা ও পলি জমে থাকায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার বিপর্যয় এড়াতে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন।

বন্যায় নেপালের কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালকে সব ধরনের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। উদ্ধার তৎপরতায় দুই দেশের কর্মকর্তারা সমন্বয় করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, বন্যার পর দেশটির অন্তত আট নাগরিকেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভতে কোশী নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিশে ভারতে গান্ধক নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নেপাল-চীন সীমান্তের এই দুর্যোগের প্রভাব ভারতের নদী অববাহিকাতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version