ইউরোপে ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিকে লক্ষ্য করে সমুদ্র থেকে ড্রোন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া—সিআইএ এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্পেনের সংবাদপত্র এল মুন্দোকে লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ এক বেনামি সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপের কয়েকটি সরকারকে মহাদেশটিতে রাশিয়ার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ ও তা বাড়ানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাশিয়া বিস্ফোরকবোঝাই গেরবেরা ড্রোন সমুদ্র থেকে উড়িয়ে কোনো স্থানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, অরক্ষিত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা কোনো বন্দর বা বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এ ধরনের উসকানিমূলক হামলা পূর্ব ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অনুপ্রবেশ ও কথিত নাশকতার অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ঘটতে পারে। এসব হামলা এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেরবেরা ড্রোনে প্রায় ৪ থেকে ৫ কেজি বিস্ফোরক বহন করা যায়। এটি ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে এবং সর্বোচ্চ ৬০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম।
আগস্টের শেষ দিকে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করার পর লিথুয়ানিয়া এই সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। বাল্টিক অঞ্চলের একটি দেশের কূটনৈতিক সূত্র এল মুন্দোকে জানিয়েছে, পরে তাদের র্যাটক্লিফের ওই সফর সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়।
এল মুন্দোর সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকও জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সিআইএ প্রতিবেদন ঘুরছে, যেখানে সম্ভাব্য হামলার কথা বলা হয়েছে।
তবে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, তারা ওই প্রতিবেদনের অস্তিত্ব স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি এবং এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সিআইএর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
এদিকে, রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে আয়ারল্যান্ডের শ্যানন বিমানবন্দরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন র্যাটক্লিফ। বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা জানাতে রাজি হননি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি।
বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদরিস রয়টার্সকে বলেন, মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা ও অন্যান্য ধরনের ‘হাইব্রিড’ তৎপরতা চালাতে পারে।
বুদরিস বলেন, “রাশিয়ার পক্ষ থেকে চাপকে আড়াআড়িভাবে, অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে আরও বিস্তৃত করার কিছু চিন্তাভাবনা রয়েছে।”
এদিকে, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নতুন এক হুমকি মূল্যায়নে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাও আগামী কয়েক মাসে রাশিয়ার হাইব্রিড যুদ্ধ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটি বলেছে, “আগামী কয়েক মাসে রাশিয়া পশ্চিমা দেশ ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে আরও ঘন ঘন হাইব্রিড হামলা চালাবে এবং এসব হামলায় আগের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর আরও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।”
জার্মানি লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার পর হাইব্রিড হামলা ও নাশকতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত মাসের ওই হামলার ঘটনায় বেলারুশের এক নাগরিক এবং দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক রুশ নাগরিককে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া ইউরোপকে ভয় দেখিয়ে ইউক্রেনকে সমর্থন করা থেকে সরে আসতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
কালাসের ভাষ্য, রাশিয়া আরও বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। এর জবাবে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান তিনি। এর মধ্যে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ এবং সামরিক-শিল্প খাতকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, হাইব্রিড হামলা এখন আর শুধু হুমকি নয়।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, “এগুলো শুধু হুমকি নয়; এগুলো বাস্তব হামলা।” তিনি অগ্নিসংযোগ, বিস্ফোরণ, ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে রাশিয়ার একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবেশের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন।
পোলিশ সেনাবাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড বুধবার জানায়, রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ থেকে একটি রুশ সামরিক এমআই-৮ হেলিকপ্টার অল্প সময়ের জন্য পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল।
পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ক্রজিশতোফ গাওকোভস্কি আরও বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় দেশটির মধ্যাঞ্চলে একটি স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্রে আগুন লাগার ঘটনাটিও সম্ভবত হাইব্রিড হামলা। এতে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হয়।
তবে আগুনের ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে জানান তিনি। গাওকোভস্কির ভাষ্য, “অনেক আলামতই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি রাশিয়ার নতুন হামলার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
তবে এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গুস সাখনা রাশিয়ার সম্ভাব্য তাৎক্ষণিক হামলা নিয়ে অতিরিক্ত আশঙ্কা প্রকাশের বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “রাশিয়া ন্যাটো বা ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সক্রিয় সামরিক আগ্রাসনের সক্ষমতা রাখে কিংবা এর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমনটা আমরা দেখছি না।” ইউক্রেনে রুশ বাহিনী এখনো যুদ্ধে নিয়োজিত থাকায় এ ধরনের অভিযানের সক্ষমতা মস্কোর নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ক্রেমলিন বরাবরই ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ এবং কোনো ধরনের সংঘাতের পরিকল্পনা করার কথা অস্বীকার করে আসছে।
