স্পেনে লুকিয়ে থাকা যুক্তরাজ্যের ১২ জন শীর্ষ পলাতক আসামিকে ধরতে নতুন করে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। ‘অপারেশন ক্যাপচুরা’ নামের এই দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার এই নতুন তল্লাশি শুরু হয়। এই পলাতক আসামিরা হত্যা, মাদক পাচার এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, চলতি বছরের তালিকায় থাকা এই ১২ জনের প্রত্যেকেই স্পেনের তেনেরিফ, মারবেলা, অ্যালিক্যান্ট এবং মালগার মতো ব্রিটিশ প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আত্মগোপন করে আছেন। ২০ বছর আগে শুরু হওয়া এই যৌথ অভিযানের মাধ্যমে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা ১১১ জন পলাতক আসামির মধ্যে ৯৮ জনকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রায় ৯০ শতাংশ সাফল্য।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) স্বাধীন দাতব্য সংস্থা ক্রাইমস্টপারস, স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্প্যানিশ পুলিশ বাহিনী এবং যুক্তরাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যৌথ অংশীদারত্বে এই ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অভিযান পরিচালনা করছে।
স্পেনের অ্যালিক্যান্টে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তল্লাশি অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে এনসিএর অপারেশনস ডিরেক্টর জেনারেল রব জোনস, ব্রিটিশ দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন সারাহ কাউলি, স্পেনের সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্স এগেইনস্ট টেররিজম অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইমের (সিআইটিসিও) director ফ্রান্সিসকো জাভিয়ের মারিন লিজারাগা, গার্ডিয়া সিভিল ও স্প্যানিশ ন্যাশনাল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ক্রাইমস্টপারসের প্রধান নির্বাহী মার্ক হ্যালাস উপস্থিত ছিলেন।
অনুস্থানে রব জোনস বলেন, ‘অপারেশন ক্যাপচুরার ২০তম বার্ষিকীতে আমাদের বার্তা খুবই স্পষ্ট। স্পেন পলাতকদের জন্য কোনো নিরাপদ স্বর্গ নয়। আমাদের এই অংশীদারত্ব বারবার প্রমাণ করেছে যে আপনারা যদি পালিয়ে যান, আমরা আপনাদের খোঁজা বন্ধ করব না। আমরা আপনাদের খুঁজে বের করবই এবং বিচারের মুখোমুখি করব।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘পলাতকেরা পালিয়ে থাকার সময়ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে না। তারা স্পেন এবং যুক্তরাজ্য উভয় দেশের সমাজেরই ক্ষতি করে যাচ্ছে এবং বড় বড় ব্রিটিশ প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিশে গিয়ে চোখের আড়ালে থাকার চেষ্টা করছে। এই মানুষগুলো আপনাদের প্রতিবেশীর উপযোগী নয়।’
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ফ্রান্সিসকো জাভিয়ের মারিন লিজারাগা বলেন, ‘পলাতক আসামিদের তাড়া করা মূলত ভুক্তভোগীদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধেরই বহিঃপ্রকাশ। এটি ভুক্তভোগীদের জন্য একটি ন্যায়বিচার।’ তিনি আরও বলেন, ‘সহযোগিতা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন এবং যুক্তরাজ্য কার্যকর সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। বছরের পর বছর ধরে আমাদের যৌথ কাজ এটিই প্রমাণ করেছে যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত প্রচেষ্টা সবসময় সফল ফলাফল এনে দেয়।’
চলতি বছরের এই মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষ আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ৪৯ বছর বয়সী সাইমন ডাটন। বিশাল স্কেলে কোকেন আমদানি ও অর্থ পাচারের অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এই কয়েদিকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নিতে খুঁজছে পুলিশ। তাঁর এক চালানের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড। তাঁর বাম বাহুতে ‘র্যাচেল’ নামের ট্যাটু এবং চিবুক, বাম হাত ও ডান পায়ে ক্ষতের দাগ রয়েছে। আরেক আসামি ৪৮ বছর বয়সী ডিন এইটিন। নিজের মালিকানাধীন দুটি কোম্পানির ভুয়া ভ্যাট ফেরতের দাবি করার অভিযোগে তিনি ওয়ান্টেড। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান।
এ ছাড়া ২০০৭ সালে গ্লাসগোতে থমাস ক্যামেরন নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে ৬২ বছর বয়সী ডেরেক ম্যাকগ্রা ফার্গুসনকে খোঁজা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ভুয়া নাম ব্যবহার করে জীবনযাপন করছেন এবং তিনি স্কটল্যান্ড পুলিশেরও শীর্ষ মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি। অন্যদিকে, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মামলায় সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড এড়াতে পলাতক রয়েছেন ৫০ বছর বয়সী ফিলিপ ব্যারি ফস্টার। মডেলিংয়ের কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
এই তালিকায় আরও রয়েছেন ২৩ বছর বয়সী রুশ নাগরিক আলেকসান্দর কুকসভ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁকে এই মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া সশরীরে অসংখ্য ট্যাটু করা ৩৩ বছর বয়সী স্পেনসার ডিলন ল্যাম্ব মাদক চাষ ও সরবরাহের জন্য এবং কোকেন ও গাঁজা সরবরাহ এবং অপরাধমূলক অর্থ নিজেদের হেফাজতে রাখার অভিযোগে ৩৪ বছর বয়সী লিয়াম মাইকেল মারেকে খুঁজছে পুলিশ।
অন্যান্য আসামিদের মধ্যে ৪০ বছর বয়সী ফ্রান্সিস ডেভিড পার্কারের বিরুদ্ধে কগিন্স নামের এক অপরাধী চক্রের হয়ে অর্থ আদায় ও মাদক পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০০৪ সালে লিয়াম কেলি এবং ২০০৫ সালে লুসি হারগ্রিভসকে হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর বয়সী কেভিন থমাস পার্লেকে খুঁজছে পুলিশ। তাঁর মাথার চুল লাল রঙের এবং তিনি দক্ষিণ স্পেনে লুকিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যজুড়ে কয়েক কেজি কোকেন সরবরাহের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ৪১ বছর বয়সী ম্যাথিউ পারভেসকেও খুঁজছে পুলিশ।
তালিকার শেষ দুই আসামি হলেন ৩৭ বছর বয়সী জন রক্স এবং ৩৪ বছর বয়সী চার্লি সালিসবারি। ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যৌন অপরাধ করার অভিযোগে রক্সকে এবং কোকেন সরবরাহ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চার্লি সালিসবারিকে ওয়ান্টেড ঘোষণা করা হয়েছে।
পলাতক এই আসামিদের সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে তা সম্পূর্ণ বেনামে যুক্তরাজ্যের ক্রাইমস্টপারসের নম্বরে (0800 555 111) এবং স্পেনে থাকা ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ ফ্রি কল নাম্বারে (900 926 111) জানাতে পারেন। এ ছাড়া ক্রাইমস্টপারসের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তথ্য পাঠানোর ডিজিটাল ফরম রয়েছে।
