মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬   |   ১৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এ বছর স্পেনে তিনটি প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি দেশটির রেল যোগাযোগের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির রেল অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

গত বুধবারের (২৮ অক্টোবর) দুর্ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দুর্ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিনটি দুর্ঘটনায় অন্তত ১১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

কেউ কেউ দাবি করছেন, স্পেনে ধারাবাহিকভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে ইসরায়েল।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা নিয়ে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পেনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জন্য দেশটিকে ‘তাৎক্ষণিক মূল্য’ দিতে হবে।

এ ছাড়া স্পেনের সাবেক রেলওয়ে নিরাপত্তাপ্রধান ও পরিবহনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর ইসরায়েলি একটি রেল সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও দুর্ঘটনাগুলোতে তেল আবিবের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে অনলাইন আলোচনাকে উসকে দিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি।

দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে কী কারণ?

গত ২৮ অক্টোবর স্পেনের তোলেদো প্রদেশের উর্দা শহরের কাছে একটি দ্রুতগতির ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত ৬৮ জন নিহত হন। আহত হন ১০০ জনের বেশি।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, কম্পিউটার ব্যবস্থার ত্রুটি এবং মানুষের ‘ব্যাখ্যাতীত’ ভুলের সমন্বয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি ত্রুটির কারণে রেলপথের ৬৫ কিলোমিটার এলাকায় স্বয়ংক্রিয় সংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এতে ওই এলাকার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মীদের ম্যানুয়ালি ট্রেন চলাচল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।

এ সময় মাদ্রিদের এক রেলকর্মী দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটির দিকে এগিয়ে যাওয়া দ্রুতগতির ট্রেনটিকে ‘ব্যাখ্যাতীত’ একটি নির্দেশনা দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেন। এর পরই ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।

দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত নাশকতা ছিল কি না, তা নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথে কর্দোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে আরেকটি দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীতমুখী রেলপথে ঢুকে পড়ে। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রেনের সঙ্গে সেটির সংঘর্ষ হয়। এতে ৪৬ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হন।

পরে তদন্তে দুর্ঘটনার জন্য রেললাইনের একটি ভাঙা অংশকে দায়ী করা হয়।

এর দুই দিন পর, ২০ জানুয়ারি বার্সেলোনার কাছে আরেকটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনচালক নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হন।

তদন্তে বলা হয়, রেললাইনের পাশের একটি দেয়াল ধসে পড়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ রেললাইনে পড়ে ট্রেনটিকে লাইনচ্যুত করে।

ইসরায়েলের দিকে অভিযোগের তির কেন?

প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে ইসরায়েলের পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পেছনে মূলত দুটি বিষয়কে সামনে আনছেন ব্যবহারকারীরা।

প্রথমত, স্পেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিরোধের মধ্যে নেতানিয়াহুর দেওয়া হুঁশিয়ারি।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা, তেল আবিবের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরানে হামলা চালাতে যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্পেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু বলেছিলেন, স্পেনের ‘ভণ্ডামি ও শত্রুতামূলক আচরণ’ তিনি সহ্য করবেন না। দেশটিকে কূটনৈতিক যুদ্ধ চালাতেও দেবেন না।

দ্বিতীয়ত, স্পেনের সাবেক পরিবহনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রেলওয়ে অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধানের ইসরায়েলি একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তেল আবিবভিত্তিক রেল সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইলাস ইসাবেল পার্দো দে ভেরাকে নিজেদের উপদেষ্টা পর্ষদে নিয়োগ দেয়। এর আগে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেলওয়ে অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত দেশটির পরিবহনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

এই নিয়োগের বিষয়টিও দুর্ঘটনাগুলোতে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনলাইন আলোচনায় উঠে আসছে। তবে শুধু এই নিয়োগ বা দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধ থেকে দুর্ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ইসরায়েলের নাশকতা ও সাইবার হামলার ইতিহাস

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিদেশে গোপনে নাশকতা, সাইবার হামলা ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়। দেশটির বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সামরিক সাইবার ইউনিট ইউনিট ৮২০০-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

২০০০-এর দশকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে স্টাক্সনেট নামের একটি কম্পিউটার ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের প্রথম প্রকাশ্যে পরিচিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই ভাইরাসটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার সেন্ট্রিফিউজ লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। এতে প্রায় ১ হাজার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ হামলার পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

২০২০ সালে ইরানের বন্দর আব্বাসে অবস্থিত কৌশলগত শহিদ রাজায়ি বন্দরে বড় ধরনের সাইবার হামলা হয়। এতে বন্দরের যানবাহন চলাচল, জাহাজ পরিচালনা ও টাগবোট নিয়ন্ত্রণের কম্পিউটার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। স্থল ও সমুদ্রপথে কয়েক মাইলজুড়ে যানজট তৈরি হয়। এ হামলার পেছনেও ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।

২০২৪ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ সদস্যদের ব্যবহৃত হাজার হাজার পেজার ও হাতে বহনযোগ্য রেডিও যন্ত্র একযোগে বিস্ফোরিত হয়। জটিল সরবরাহব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে এসব যন্ত্রে বিস্ফোরক স্থাপনের ওই অভিযানের পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের হাত ছিল বলে ব্যাপকভাবে জানানো হয়। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি

স্পেনের ২৮ অক্টোবরের ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের গোপন ভূমিকা রয়েছে—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

দুর্ঘটনার আগে রেল যোগাযোগ ও কম্পিউটার ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার বিষয়টির সঙ্গে অনেকেই নেতানিয়াহুর আগের হুঁশিয়ারির যোগসূত্র খুঁজছেন। পাশাপাশি স্পেনের রেলব্যবস্থায় ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে আনছেন তাঁরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জো ব্ল্যাক নামের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ইসরায়েল স্পেনের ট্রেনগুলোকে দুর্ঘটনায় ফেলছে।’

আরেক ব্যবহারকারী প্রযুক্তিগত ত্রুটির বিষয়টি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘স্পেনের রেলব্যবস্থায় ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো যুক্ত রয়েছে। ইসরায়েলের হুমকির পর থেকেই স্পেনের ট্রেনগুলো একের পর এক দুর্ঘটনায় পড়ছে।’

অন্য এক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, ‘দেশগুলো ইসরায়েলকে অসন্তুষ্ট করার পরই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। তাদের কম্পিউটার ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চুক্তি ইসরায়েলের সঙ্গে—এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক কাকতালীয় ঘটনা। এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনাগুলোর তদন্তে উঠে আসা কারিগরি ও অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলোর বাইরে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো অভিযোগ ও জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version