বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে অনিয়মিত অভিবাসন ও অবৈধভাবে কাজ করার বিরুদ্ধে দেশটির ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অভিযান পরিচালনা করেছে ব্রিটিশ হোম অফিস। ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট টিমের নেতৃত্বে চালানো এই অভিযানে সারাদেশে রেকর্ড সংখ্যক অনিয়মিত অভিবাসী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

হোম অফিসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অভিযান বেড়েছে ৭৭ শতাংশ এবং অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। এই হিসাব ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের।

এই ১৮ মাসে যুক্তরাজ্যজুড়ে ১৭ হাজার ৪০০টির বেশি অভিযান চালানো হয়েছে সন্দেহভাজন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল নেইল বার, কার ওয়াশ, সেলুন, নির্মাণস্থল ও টেকঅ্যাওয়ে রেস্তোরাঁর মতো খাতগুলো, যেগুলোতে অনিয়মিত শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এসব অভিযানে ১২ হাজার ৩০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হোম অফিসের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান সৎ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অন্যায্য প্রতিযোগিতা করছে এবং মানব শোষণের মাধ্যমে কালো অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।

হোম অফিস জানিয়েছে, ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্টে অতিরিক্ত ৫০ লাখ পাউন্ড বরাদ্দ দেওয়ায় অভিযান আরও জোরদার করা সম্ভব হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগকারী ব্যবসা এবং মানব পাচারকারী অপরাধ চক্র শনাক্ত ও দমনে।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেও অভিযানের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে সেখানে ১৮৭টি অভিযান চালিয়ে ২৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় সেখানে অভিযান বেড়েছে ৭৬ শতাংশ, আর গ্রেপ্তার বেড়েছে ১৬৯ শতাংশ। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সেক্রেটারি হিলারি বেন বলেন…

অবৈধভাবে কাজ করানো সৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মানব শোষণ থেকে লাভবান অপরাধী চক্রগুলোকে শক্তিশালী করছে। এই সরকার রেকর্ড মাত্রায় অভিযান জোরদার করেছে। বার্তাটি পরিষ্কার, আইন ভাঙলে কোনো ছাড় নেই।

অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন…

আমাদের সমাজে অবৈধভাবে কাজ করার কোনো জায়গা নেই। ব্রিটিশ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যাতে কালো অর্থনীতিতে জড়িত অনিয়মিত অভিবাসীরা আর লুকিয়ে থাকতে না পারে। সীমান্তে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি কোনো কিছুতেই পিছপা হব না।

সরকারের মতে, অবৈধ কাজের সুযোগ বন্ধ না করা গেলে মানব পাচারকারী চক্রগুলো ছোট নৌকায় করে বিপজ্জনক যাত্রায় মানুষকে যুক্তরাজ্যে আসতে উৎসাহিত করতেই থাকবে।

হোম অফিস জানায়, গত এক বছরে ৫০ হাজার অনিয়মিত অভিবাসীকে অপসারণ ও প্রত্যাবাসন করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন, স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন এবং তৃতীয় দেশে পাঠানোর ঘটনাও রয়েছে।

অভিযানের স্বচ্ছতা ও আইনি প্রক্রিয়া জোরদারে সারা যুক্তরাজ্যে এখন ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তাদের বডি-ওন ভিডিও ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা বর্তমানে সব টিমে কার্যকর। এছাড়া, নতুন বর্ডার সিকিউরিটি, অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট-এর আওতায়, গিগ ইকোনমি, অস্থায়ী ও সাব-কন্ট্রাক্ট কর্মী এবং ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও কাজ করার অধিকার যাচাই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। সরকার একই সঙ্গে ডিজিটাল আইডি চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যা পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কাজের অধিকার প্রমাণে বাধ্যতামূলক করা হবে।

মানব পাচার চক্র ভাঙতে গঠন করা হয়েছে অর্গানাইজড ইমিগ্রেশন ক্রাইম ডোমেস্টিক টাস্কফোর্স। এতে একসঙ্গে কাজ করছে, ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি, ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিল, বর্ডার সিকিউরিটি কমান্ড ও ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট। গত ১২ মাসে মানব পাচার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এই সময়ে প্রায় ৪ হাজারবার পাচার কার্যক্রম ব্যাহত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ছোট নৌকায় করে আসা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোও শুরু হয়েছে।

হোম অফিসের ভাষ্য, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, যুক্তরাজ্যের সীমান্ত আরও সুরক্ষিত করা, অবৈধ শ্রমবাজার বন্ধ করা, মানব পাচারকারী চক্রের ব্যবসা ভেঙে দেওয়া এবং বিপজ্জনক পথে অভিবাসনে নিরুৎসাহিত করা।

সরকার বলছে, অবৈধভাবে কাজ করার সুযোগ যত সংকুচিত হবে, ততই অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি কমবে, এটাই এই কঠোর অভিযানের মূল বার্তা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version