সোমবার, ২৪ই আগস্ট, ২০২৬   |   ৯ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌন অপরাধে দণ্ডিত কয়েক হাজার বন্দির তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ওষুধ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস। একজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, পাইলট কর্মসূচি সফল হলে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশটির সব কারাগার ও প্রবেশন সেবায় এ চিকিৎসা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

কারাগারে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ব্যবহারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছেন অধ্যাপক বেলিন্ডা উইন্ডার। তিনি জানান, প্রতি চারজন যৌন অপরাধীর মধ্যে প্রায় একজনকে এই চিকিৎসার আওতায় আনা হতে পারে। বর্তমানে কারাগারে থাকা যৌন অপরাধীদের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭৫০।

সরকারি সূত্রের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে স্বেচ্ছায় যৌনাকাঙ্ক্ষা দমনকারী ওষুধের ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রশাসন।

তবে শিশু যৌন নিপীড়ক ও ধর্ষকদের মতো গুরুতর যৌন অপরাধীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রাসায়নিক খোজাকরণ বা ‘কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন’ চালুর যে প্রতিশ্রুতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে মন্ত্রীরা নতুন করে ভাবছেন।

বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ১৫ হাজার বন্দি যৌন অপরাধের দায়ে সাজা ভোগ করছেন। এ ছাড়া অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতনের সন্দেহে প্রতি মাসে ৮৫০ জনের বেশি পুরুষ গ্রেপ্তার হচ্ছেন।

‘মেডিকেশন টু ম্যানেজ প্রবলেমেটিক সেক্সুয়াল অ্যারাউজাল’ (এমএমপিএসএ) নামে পাইলট কর্মসূচিটি আগামী নভেম্বরে ১০টি থেকে বাড়িয়ে ২০টি কারাগারে চালু করা হবে।

এই কর্মসূচির আওতায় অনাকাঙ্ক্ষিত ও তীব্র যৌন চিন্তা, ক্রমাগত কামোত্তেজনা এবং অস্বাস্থ্যকর যৌন তাড়না ও আচরণে ভোগা অপরাধীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সারট্রালিনের মতো সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিউপটেক ইনহিবিটর (এসএসআরআই) জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। এসব ওষুধ অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন চিন্তা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

এ ছাড়া অ্যান্টি-অ্যান্ড্রোজেন জাতীয় ওষুধও ব্যবহার করা হতে পারে। এগুলো টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমিয়ে যৌনাকাঙ্ক্ষা হ্রাস করে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ওষুধ টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বয়ঃসন্ধির আগের পর্যায়েও নামিয়ে আনতে পারে।

উইন্ডার জানান, পাইলট কর্মসূচি ইতিবাচক ফল দিলে আগামী ২৮ মাসের মধ্যে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সব কারাগার এবং প্রবেশন সেবায় এ চিকিৎসা চালুর জন্য কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত হতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘মধ্যবর্তী ফলাফল যদি কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় কর্মসূচিটি সার্বিকভাবে চালুর জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।’

উইন্ডার আরও বলেন, কর্মসূচির আওতায় আসা ব্যক্তিরা ওষুধ সেবন এবং পুনরায় অপরাধ না করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের যথাযথ চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

গত বছর তৎকালীন আইনমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্ট সদস্যদের জানিয়েছিলেন, যৌন অপরাধীদের জন্য স্বেচ্ছায় রাসায়নিক খোজাকরণ কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে চালুর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। পাশাপাশি এটি বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।

তবে এ পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যৌন অপরাধীদের ওপর প্রোজ্যাক নামের ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্যতম প্রধান গবেষক উইন্ডারও বাধ্যতামূলক ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাধ্যতামূলক পদ্ধতি চালু করতে হলে বিপুলসংখ্যক বন্দির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে, যাতে বোঝা যায় কারা এই চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পড়েন। অথচ প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যক্তির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এর জন্য বিপুল চিকিৎসা অবকাঠামো ও সম্পদের প্রয়োজন হবে।

তার মতে, চিকিৎসা বাধ্যতামূলক করা হলে অপরাধীদের সঙ্গে চিকিৎসকদের আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে এর অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

ওষুধগুলোকে ‘রাসায়নিক খোজাকরণ’ বলতেও আপত্তি জানিয়েছেন উইন্ডার। তার ভাষ্য, খোজাকরণের মতো এসব ওষুধের প্রভাব স্থায়ী নয়। ওষুধের কার্যকারিতা বজায় রাখতে নিয়মিত সেবন করতে হয়।

চলতি মাসের শুরুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ঘোষণা দেন, ধর্ষণ, গ্রুমিং এবং শিশুদের ওপর গুরুতর যৌন নির্যাতনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের আগাম মুক্তির কর্মসূচির আওতায় রাখা হবে না। তবে চার বছরের কম সাজাপ্রাপ্ত অন্যান্য যৌন অপরাধীরা এখনো আগাম মুক্তির সুযোগ পাবেন।

অন্য অপরাধীদের তুলনায় যৌন অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যৌন অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পুনরায় অপরাধে জড়িয়েছেন। চুরির মতো অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

তবে কারাবন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচিটি চালুর আগে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেস্টোস্টেরন দমন করলে অস্টিওপরোসিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া এ ধরনের চিকিৎসা নিয়ে দৈবচয়নভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা কম হওয়ায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যও নেই।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version