ব্রেক্সিটের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিত দিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, লেবার পার্টির পরবর্তী নির্বাচনী ইশতেহারে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পুনরায় যোগদানের বিষয়ে গণভোট অন্তর্ভুক্ত করা ‘সম্ভব’।
আইটিভি নিউজকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি মানেই যে ‘হুট করে গণভোটে চলে যাওয়া নয়’। তবে তিনি জানান, জনমত যদি পুনরায় যোগদানের পক্ষে ‘ইঙ্গিত দেয়’, তবে পরবর্তী ইশতেহারে এ বিষয়ে ভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন তিনি। এ ছাড়া কোনো গণভোট ছাড়াই ইইউতে ফেরার সরাসরি প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লড়াইয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
বুধবার ফ্রান্স ও স্পেনের শীর্ষ নেতারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের ফিরে আসাকে সমর্থন জানানোর পরই বার্নহ্যামের এমন বক্তব্য এল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ব্রিটেন যদি পুনরায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা হবে একটি ‘চমৎকার খবর’ এবং ‘একটি ভালো সিদ্ধান্ত’। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ব্রিটেনকে ইইউতে ‘উন্মুক্ত বাহু দিয়ে’ স্বাগত জানানো হবে।
এর আগে বার্নহ্যাম বলেছিলেন যে তিনি ব্রেক্সিট বাতিলের পক্ষে উন্মুক্ত এবং ব্লকে পুনরায় যোগদানের প্রস্তাব নিয়ে তিনি ‘একেবারে শেষ পর্যন্ত’ যেতে পারেন। আরেকটি গণভোট এড়িয়ে সরাসরি ইশতেহারে ইইউতে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চ্যানেল ফোর নিউজকে বার্নহ্যাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছি না।’
ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের আগেও বার্নহ্যাম বলেছিলেন যে তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই যুক্তরাজ্যকে আবার ইইউতে ফিরে দেখতে চান। স্কাই নিউজে তিনি এখনও সেই অবস্থানে অটল আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবদ্দশার কথা বলেছিলাম এবং আমি বলেছি যে আমি তা থেকে পিছিয়ে আসছি না।’
এক দশকের লক্ষ্যহীনতা ও বিভাজনের জন্য ব্রেক্সিটকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বিষয়টিকে কেবল ‘ঝুলিয়ে রাখা যথেষ্ট নয়’। ব্রাসেলসের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়ে সব বিকল্পের ‘ভালো ও মন্দ দিকগুলো’ খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বিবিসির টুডে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একটি বিকল্প হলো ‘একেবারে শেষ পর্যন্ত যাওয়া’ এবং পূর্ণ সদস্যপদ পুনরুদ্ধার করা।
মাখোঁ বার্নহ্যামের বক্তব্যকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছেন যে সদস্যপদের শর্তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মাঝামাঝি ছাড় দেওয়া হবে না। বুধবার সানচেজের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে, তারা যখন আমাদের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে চাইবে, তখন বাইরে থাকা একটি সমস্যা তৈরি করে: আপনি ইউনিয়নের স্বাধীনতাগুলোর মধ্য থেকে বেছে বেছে নিতে পারবেন না, কিংবা আপনার সুবিধামতো কিছু বিষয় গ্রহণ করে বাকিগুলো প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না।’
ইইউর সাবেক ব্রেক্সিট কর্মকর্তারা এর আগেই সতর্ক করেছিলেন যে যুক্তরাজ্য পুনরায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলে কোনো ‘ব্যতিক্রমী’ সুবিধা পাবে না। যুক্তরাজ্য চাইলে পুনরায় যোগ দিতে পারবে বলে ইইউ স্পষ্ট করলেও আগের শর্তাবলীতে ফিরতে পারার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফিরতে চাইলে যুক্তরাজ্যকে ইউরো মুদ্রা গ্রহণ করতে হতে পারে, পাসপোর্টমুক্ত সেনজেন অঞ্চলে যোগ দিতে হতে পারে এবং পূর্বে সমঝোতা করা অর্থনৈতিক ছাড় (রিবেট) পুনরায় পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এই রিবেট ছিল ১৯৮৪ সালে মার্গারেট থ্যাচারের সমঝোতা করা একটি আর্থিক সুবিধা, যার মাধ্যমে ইইউ বাজেটে ব্রিটেনের আর্থিক অবদান প্রায় ৬৬ শতাংশ কমানো হয়েছিল।
দলীয় নেতা হিসেবে লেবার পার্টির সম্মেলনে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ইইউ ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাজ্যের ‘উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে’। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের সময় তিনি দেশের সামনে বিকল্পগুলো তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২৪ সালে লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে শুল্ক ইউনিয়ন বা একক বাজারে ফিরে যাওয়া কিংবা ইইউর সঙ্গে অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো বাতিল করা হয়েছিল। বার্নহ্যাম আগে বলেছিলেন যে তিনি লেবার পার্টির এই ব্রেক্সিট ‘রেড লাইন’ বজায় রাখবেন, তবে পরবর্তীতে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে তিনি এর বাইরে যাওয়ার সুপারিশ করতে প্রস্তুত।
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কিছু বিকল্প রয়েছে যা বিবেচনা করা দরকার এবং আমাদের দেখতে হবে কোনটি বাস্তবায়নযোগ্য এবং প্রতিটির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো কী।’ বার্নহ্যাম জানান, আরেকটি সম্ভাবনা হলো ইইউ শুল্ক ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে সাবেক কনজারভেটিভ অর্থমন্ত্রী জর্জ ওসবোর্নের আহ্বানকে সমর্থন করা—যা চলতি মাসের শুরুর দিকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওসবোর্ন উল্লেখ করেছিলেন।
বার্নহ্যাম অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা যেমন আছি তেমনই থাকতে পারি। জনগণ যদি মনে করে এখানেই থাকা সঠিক, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বিকল্প।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুল্ক ইউনিয়ন নিয়ে জর্জ ওসবোর্ন যা বলেছেন আমরা তা দেখতে পারি, একক বাজার নিয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা তাদের সম্মেলনে যা বলেছে তা খতিয়ে দেখতে পারি, অথবা আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত যেতে পারি।’
ওসবোর্ন দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, ব্রেক্সিট ‘একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে’। ইইউতে ফিরে যাওয়া কঠিন হলেও শুল্ক ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দিলে তা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ওপর কিছু চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
বার্নহ্যামের এই অবস্থানের তাৎক্ষণিক সমালোচনা করেছে বিরোধী কনজারভেটিভরা। তারা অভিযোগ করেছে যে তিনি ‘ব্রেক্সিট পর্বের লড়াইগুলো পুনরায় শুরু করে পুরোনো ক্ষত জাগিয়ে তোলার’ চেষ্টা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে ইইউ ত্যাগের প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক কনজারভেটিভ ক্যাবিনেট মন্ত্রী মাইকেল গোভ বলেন, ব্রেক্সিট থেকে পিছু হটলে তা ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের মধ্যে ‘হতাশা তৈরি করবে’, কারণ এর অর্থ হবে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা আবারও ব্রাসেলসের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া।
গত ১২ মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপের ধারাক্রমের প্রেক্ষাপটেই বার্নহ্যামের এই বক্তব্য এল। এসব জরিপে দেখা গেছে, ভোটাররা মনে করছেন ব্রেক্সিট সফল হয়নি এবং দ্বিতীয় কোনো গণভোট হলে তা পুনরায় যোগদানের পক্ষে রায় দিতে পারে।
পলিটিকোর জন্য ‘পাবলিক ফার্স্ট’-এর এক নতুন জরিপ অনুযায়ী, রিফর্ম পার্টির সমর্থকদের অর্ধেকও মনে করেন ব্রিটেনের উচিত ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে ৭ জনই ব্রাসেলসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার পক্ষে।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ব্রাসেলসের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছে এই সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে যে, ব্রেক্সিট অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিশ্রুত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
