সোমবার, ১৯ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ মার্কিন শাসনের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের উচিত আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পূর্ণ সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা। শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ’ (আইপিপিআর)-এর এক নতুন নীতিবিষয়ক প্রতিবেদনে এই তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

লেবার পার্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র সুরক্ষার স্বার্থেই ইইউর অংশ হওয়া প্রয়োজন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের উচিত পুনরায় ইইউতে যোগদানের পক্ষে একটি জাতীয় ঐক্যমত্য গড়ে তোলা।

তবে প্রতিবেদনে লেবার নেতৃত্বকে ‘ব্রেক্সিট নিয়ে পড়ে থাকা বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্য যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে এসেছিল, বর্তমানের ইইউ তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্তা। ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধসহ নানা ধরনের নতুন নিরাপত্তা হুমকি ও বাস্তবতার মুখে বর্তমান ইইউ অনেক বেশি রূপান্তরিত হয়েছে।

আইপিপিআর এবং পারসুয়েশন ইউকে-র পরিচালিত এক নতুন জনমত জরিপে দেখা গেছে, মতামত প্রকাশকারী উত্তরদাতাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, বিপক্ষে ছিলেন ৩৬ শতাংশ। এমনকি নাইজেল ফারাজের ‘রিফর্ম’ পার্টিতে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন এমন লেবার ভোটারদেরও ৫৪ শতাংশ ইইউতে ফেরার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আইপিপিআরের নির্বাহী পরিচালক হ্যারি কুইল্টার-পিনার বলেন, ‘ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যথেষ্ট নয়।

যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে সেরা একটিই বিকল্প রয়েছে—আর তা হলো ইইউর পূর্ণ সদস্যপদ। এর মানে এই নয় যে আগামীকালই আরেকটি গণভোট ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু এই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে দেশ ও ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তোলার কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে।’

লেবার পার্টির সাবেক নেতা নিল কিনক আইপিপিআরের এই আহ্বানকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘১০ বছরে বিশ্ব বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের সবচেয়ে বড় বাজারের সান্নিধ্য বিবেচনায় জাতীয় স্বার্থেই পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়াই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক পথ।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে ইইউ কেবল একটি অর্থনৈতিক জোট নয়, বরং একটি বড় নিরাপত্তা জোটে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপক বাড়াচ্ছে। আইপিপিআরের সহযোগী পরিচালক লরা চ্যাপেল বলেন, ‘এখন ব্রেক্সিট নিয়ে অতীত ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করে পুরোপুরি ভবিষ্যতের দিকে নজর দেওয়ার সময়। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ধাক্কা থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করা, শিল্প খাত পুনরুজ্জীবিত করা বা নিজেদের নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে একা চলার মতো শক্তি এখন আর ব্রিটেনের নেই।’

আইপিপিআর ব্রিটিশ সরকারকে ইইউর সঙ্গে মিলে একটি ‘ইউরোপিয়ান ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে; যাতে স্যাটেলাইট যোগাযোগসহ এমন কিছু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে আনবে।

বিশেষ করে গত সপ্তাহেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে যুদ্ধের এক সংকটজনক মুহূর্তে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সীমিত করে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের এমন আচরণ ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষায় স্বাবলম্বী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্র করে তুলেছে।

প্রো-ইইউ সংগঠন ইউরোপিয়ান মুভমেন্ট ইউকে-র চেয়ারম্যান ড. মাইক গ্যালসওয়ার্থি এবং ‘বেস্ট ফর ব্রিটেন’-এর প্রধান নির্বাহী নাওমি স্মিথও এই রিপোর্টকে স্বাগত জানিয়েছেন। নাওমি স্মিথ বলেন, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য ‘আরও অনিরাপদ, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়েছে; ফলে মিত্রদের সঙ্গে যৌথভাবে বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করাই এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।

তবে সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘আমরা ইইউর সঙ্গে একটি উচ্চাভিলাষী ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছি, যা আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং যুক্তরাজ্যের তরুণ ও জনগোষ্ঠীর জন্য আরও সুযোগ তৈরি করবে।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version