সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬   |   ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নেদারল্যান্ডসের একটি বিখ্যাত শহর হলো রটারডাম। এই শহরের একটি পুরোনো বন্দরের গুদামে শুরু হয়েছে এক বিশেষ জাদুঘর, যার নাম ‘ফেনিক্স মিউজিয়াম অফ মাইগ্রেশন’। এই জায়গাটি ইতিহাসের একটি বড় সাক্ষী। কারণ, প্রায় ১০০ বছর আগে এই বন্দর থেকেই লাখ লাখ ইউরোপীয় ভাগ্যের অন্বেষণে জাহাজে চেপে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।

সদ্য নির্মিত ফেনিক্স মিউজিয়াম অফ মাইগ্রেশন নামের জাদুঘরটি শুধু তথ্য প্রদর্শন করে না বরং এটি মানুষের সাহস, দুঃখ, আশা এবং নতুন জীবনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ার গল্পগুলো তুলে ধরে। এখানে আইন বা হিসাব-নিকাশের চেয়ে মানুষের অনুভূতিগুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গত ১৬ মে ২০২৫ তারিখে সবার জন্য খুলে দেওয়া এই স্থাপনাটি। আর উদ্বোধনের পর বিশ্বে অভিবাসন নিয়ে তৈরি প্রথম শিল্প জাদুঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এটি।

ভবনের মাঝখানে ‘টর্নেডো’

ফেনিক্স জাদুঘরের স্থাপত্যশৈলী বেশ ব্যাতিক্রম কিন্তু নজরকাড়া। এটি একটি পুরোনো গুদামে তৈরি হয়েছে, যা ১৯২৩ সালে তৈরি হয়েছিল। চীনা স্থপতি মা ইয়ানসং এই ভবনের ডিজাইন করেছেন। তাঁর নকশার মূল আকর্ষণ হলো ভবনের মাঝখানে থাকা ঘূর্নিঝড় সদৃশ ‘দ্য টর্নেডো’ নামের স্থাপনাটি।

এটি আসলে ৩৩ মিটার উঁচু একটি প্যাঁচানো সিঁড়ি। ভবনের নিচতলা থেকে শুরু হয়ে ছাদের ওপরের একটি প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত উঠে গেছে সিঁড়িটি। প্লাটফর্ম উঠে পড়লে পুরো রটারডাম শহরের দৃশ্য দেখা যায়। টর্নেডোর মতো দেখতে এই ঘূর্ণায়মান সিঁড়িটি তৈরি হয়েছে ইস্পাত দিয়ে। স্থপতি মা ইয়ানসং বলেছেন, এই সিঁড়িটি আসলে একজন অভিবাসীর যাত্রাপথের প্রতীক। এই পথে চলার সময় যেমন বিভিন্ন রাস্তা বেছে নিতে হয়, নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, সিঁড়িটিও ঠিক তাই বোঝায়। সিঁড়ির কাঠগুলো দেখতে জাহাজের ডেকের মতো, যা সমুদ্রযাত্রার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

২,০০০ স্যুটকেসে ভরা ব্যক্তিগত গল্প

জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘স্যুটকেস ল্যাবিরিন্থ’। এখানে ২,০০০-এর বেশি পুরোনো লাগেজ বা স্যুটকেস সাজানো আছে। প্রতিটির সঙ্গেই আছে এক একটি মানুষের জীবনের গল্প। দর্শনার্থীরা চাইলে সেই গল্পগুলো শুনতে পারেন। কিউরেটর আবদেল কাদের বেনালি জানিয়েছেন…

এই স্যুটকেসগুলো হলো উন্নত জীবনের জন্য করা ত্যাগ, আশা আর কষ্টের স্মৃতি। এখানে ১৮৯৮ সালের একটি স্যুটকেসও আছে, যা সাইবেরিয়া পেরিয়ে নেদারল্যান্ডসে এসেছিল।

শিল্পীদের চোখে অভিবাসন

অভিবাসনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এখানে প্রায় দেড়শ শিল্পীর তৈরি শিল্পকর্ম রাখা হয়েছে। অনেকেই তাঁদের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এই কাজের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া, ‘দি ফ্যামিলি অফ মাইগ্রেন্টস’ নামে একটি ফটো প্রদর্শনী চলছে। এখানে ১৩৬ জন ফটোগ্রাফারের প্রায় ২০০টি ছবি আছে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভ্রমণ, অভিবাসন, এবং নতুন জায়গায় পৌঁছানোর দৃশ্য প্রদর্শন করে চলেছে। ইফরাত জেহাভি নামের এক শিল্পী রটারডামের ১১৬ জন মানুষের মাটির তৈরি মুখচ্ছবি বানিয়েছেন। শিল্পীর মতে এই মুখচ্ছবিগুলো মানুষের বৈচিত্র্য তুলে ধরছে।

শহরের সবার জন্য একটি জায়গা

জাদুঘরের ভেতরে ২,০০০ বর্গমিটারের একটি বড় খোলা জায়গা আছে, যার নাম ‘প্লেইন’। এটি রটারডামের মানুষের জন্য একটি মিলনকেন্দ্রের মতো। এখানে মানুষ স্কেটিং করতে পারে, বই পড়তে পারে বা নানা ধরণের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে। ফেনিক্স জাদুঘর পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি নান্দনিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version