বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আপনি কি কখনো এমন কোনো এটিএম (ATM) বুথ দেখেছেন যেখানে টাকা তোলার জন্য আপনাকে আধুনিক ইংরেজি বা আপনার মাতৃভাষা নয়, বরং প্রাচীন রোমানদের ভাষা ‘ল্যাটিন’ ব্যবহার করতে হচ্ছে? শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও, ইতালির রোম শহরের ভেতরে অবস্থিত বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটিতে এটি একটি বাস্তব চিত্র।

প্রাচীন ভাষা ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন

ভ্যাটিকান সিটির ভেতরে অবস্থিত “ইন্সটিটিউট ফর দ্য ওয়ার্কস অফ রিলিজিয়ন” (আইওআর) বা ভ্যাটিকান ব্যাংকের এটিএম বুথগুলোতে প্রবেশ করলে আপনি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন। মেশিনের স্ক্রিনে যখন ভাষার তালিকা আসবে, তখন ইংরেজি, ইতালীয়, ফরাসি বা স্প্যানিশের পাশে সগৌরবে অবস্থান করে ‘ল্যাটিন’ ভাষা।

এটিএম-এর ল্যাটিন ভাষা

সাধারণ এটিএম-এ আমরা যে শব্দগুলো দেখি, ল্যাটিন সংস্করণে সেগুলো কিছুটা ভিন্ন এবং রাজকীয় শোনায়। যেমন:

টাকা তোলার জন্য আধুনিক ইংরেজিতে যেখানে থাকে ‘ইনসার্ট ইয়োর কার্ড’ (আপনার কার্ডটি ভেতরে প্রবেশ করান) সেখানে, ল্যাটিন এটিএম-এ লেখা থাকে ‘ইন স্যের্তো শিদুলাম কুয়েসো উত ওপেরান্তি ফিয়াস’। আপনি যখন আপনার গোপন পিন  নম্বর দিতে যাবেন, তখন ল্যাটিন ভাষায় লেখা উঠবে ‘কোনিয়শেরে ভিজুম ’ (আপনার পিন নম্বরটি টাইপ করুন)। টাকা উত্তোলনের নির্দেশনা, সাধারণ ‘উইথড্রয়াল’ (টাকা উত্তোলন) এর বদলে লেখা থাকে ‘দেদুত্তিও এক্স পেকুনিয়া’। কার্ড বের করার  নির্দেশ ‘রিমুভ ইউর কার্ড’ (আপনার কার্ডটি বের করে নিন)-এর বদলে তখন স্ক্রিনে লেখা থাকে-‘শিদুলাম তুয়াম রেমোভে’। এছাড়া ধন্যবাদ জানানোর জন্য, কাজ শেষে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’-এর বদলে ‘গ্রাতিয়াস তিবি আজিমুস’ (আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাই)।

যে কারণে ল্যাটিন ভাষার ব্যবহার

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে ভাষা এখন আর সাধারণ মানুষ কথা বলার জন্য ব্যবহার করে না, তা কেন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে? এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:

১. ঐতিহ্য রক্ষা: ল্যাটিন হলো ক্যাথলিক চার্চের দাপ্তরিক বা অফিসিয়াল ভাষা। ভ্যাটিকান সিটি তার ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই ভাষাকে আধুনিক প্রযুক্তিতেও জায়গা দিয়েছে।

 ২. পণ্ডিতদের শহর: ভ্যাটিকানে বসবাসরত অনেক যাজক, কার্ডিনাল এবং ল্যাটিন ভাষার পণ্ডিতরা এখনো এই ভাষায় দক্ষ। তাদের সম্মান জানাতেই এই ব্যবস্থা।

 ৩. পর্যটক আকর্ষণ: এটি বর্তমানে পর্যটকদের কাছে একটি বড় আকর্ষণ। অনেক পর্যটক শুধুমাত্র ল্যাটিন ভাষায় এটিএম চালানোর অভিজ্ঞতা নিতেই সেখানে ভিড় জমান।

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, ল্যাটিন একটি ‘মৃত ভাষা’ কারণ এটি এখন আর কারো মাতৃভাষা নয়। কিন্তু ভ্যাটিকান সিটির এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, ভাষাটি কাগজে-কলমে বা প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখনো জীবন্ত। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ভ্যাটিকানে প্রথম এটিএম বসানো হয়, তখন থেকেই এই ল্যাটিন সংস্করণের প্রচলন শুরু হয়।

ভ্যাটিকান সিটির এই ল্যাটিন এটিএম আধুনিক বিশ্বের এক অনন্য নিদর্শন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সাথে সাথে প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও ধরে রাখা সম্ভব। আপনি যদি কখনো ভ্যাটিকান সিটি ভ্রমণে যান, তবে পোপের প্রাসাদের কাছাকাছি থাকা এই এটিএম মেশিনটি দেখে নিতে ভুলবেন না!

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version