সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২৬   |   ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় চলমান অভিবাসী সংকটের একটি ‘অবিলম্বে, জোরালো এবং আনুপাতিক’ সমাধানের দাবিতে গত রবিবার শহরটির প্রধান চার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে শত শত বাসিন্দা সমবেত হয়েছিলেন।

সেউতার প্রধান চার ধর্মীয় সম্প্রদায়—খ্রিস্টান, মুসলিম, ইহুদি ও হিন্দু—ঐক্যবদ্ধভাবে গত রবিবার বিকেলে কন্সটিটিউশন স্কয়ারে শত শত মানুষকে একত্রিত করে। এই সমাবেশের উদ্দেশ্য ছিল অভিবাসী সংকটের সমাধান দাবি করা এবং শহরের সব ধর্মের মানুষের সংহতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা করা।

‘যথেষ্ট হয়েছে, সেউতা আত্মসমর্পণ করবে না’ স্লোগানের অধীনে আয়োজিত এই সমাবেশে মাদ্রিদ সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ‘পরিত্যাগ’ করার অভিযোগ তোলেন।

জনতা এ সময় ‘সেউতা বিক্রির জন্য নয়, সেউতাই স্পেন’ এবং ‘সানচেজ, পদত্যাগ করো’ বলে স্লোগান দেয়। পরে কিছু বিক্ষোভকারী শহরের সরকারি প্রতিনিধি কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রার মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শন অব্যাহত রাখেন।

এরই মধ্যে ‘প্লাজা দে লস রেয়েস’-এ স্পেনের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ভিটো কুইলেস এসে পৌঁছালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে সেউতার বাসিন্দাদের মধ্যে ‘বিভাজন’ সৃষ্টি করতে আসার অভিযোগ তোলেন।

গত সপ্তাহে সেউতার ঘটনার পর স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর ইতালির আরোপিত সীমান্ত কড়াকড়ি রোম প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইতালি থেকে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য স্পেনের বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে সাময়িকভাবে তল্লাশি পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস গত শনিবার যুব ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী সিরা রেগো-র সাথে দেখা করেন, যিনি মূলত অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এই স্বায়ত্তশাসিত শহরে এসেছিলেন। সরকার এ পর্যন্ত ১,৩৪২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে চিহ্নিত করেছে, যদিও অন্য অনেকের নিবন্ধন এখনও বাকি।


বৈঠকের পর ভিভাস জোর দিয়ে বলেন যে, তাঁর সরকারের অবস্থান হলো—এসব অপ্রাপ্তবয়স্কদের মরক্কোতে ফেরত পাঠানো উচিত। তিনি বলেন, ‘একমাত্র পথ হলো তারাজাল সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে মরক্কো’

সেউতার এই নেতা পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ অচল ও টেকসইহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আরও বেশি সম্পদ ও নিরাপত্তা কর্মী দাবি করেছেন। অন্যদিকে যুব ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছে এবং দাবি করেছে যে প্রতিটি বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

রেগো ‘যখনি সম্ভব’ পারিবারিক পুনর্মিলনের পক্ষে যুক্তি দেখান, তবে স্মরণ করিয়ে দেন যে ‘অভিভাবকহীন অনেক অভিবাসী ছেলেমেয়ের কোনো পরিবার নেই, তাই এই ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত সম্প্রদায়গুলোকে তাদের অভিভাবক হিসেবে 

কাজ করতে হবে এবং তাদের অধিকারের গ্যারান্টি দিতে হবে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, সরকার এই আশ্রয় বা রিসিভিং প্রক্রিয়ার জন্য ‘প্রয়োজনীয় সমস্ত সম্পদ’ মোতায়েন করবে এবং সেউতার জন্য আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও মানবিকসহ ‘সম্পূর্ণ সহায়তার গ্যারান্টি দেবে’।

আগামী ১৩ আগস্ট ডাকা ‘সেক্টোরাল কমিশন অন চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস’ নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে সেউতা থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

উগ্র ডানপন্থী দল ‘ভক্স’ ঘোষণা করেছে যে, ক্যাস্টিল অ্যান্ড লিওন, এশত্রেমাদুরা এবং আরাগন অঞ্চলে এই খাতের দায়িত্বে থাকা তাদের আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্টরা এই বৈঠকে যোগ দেবেন না। দলটি ‘শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে থাকবে’ স্লোগানের মাধ্যমে এই স্থানান্তরের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

সেউতার প্রধান চার ধর্মীয় সম্প্রদায় গত রবিবারের সমাবেশের ডাক দিয়েছিল মূলত একতাবদ্ধতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক যৌথ বার্তা দিতে এবং শহরের চলমান সংকটজনক পরিস্থিতির সমাধান দাবি করতে। হুয়ান হেসুস ভিভাস নিজেও সেউতার জনগণকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে এই সমাবেশটি দলীয়-রাজনৈতিক পার্থক্যের ঊর্ধ্বে।

গত শনিবার তিনি বলেন, ‘এটি কারও একক সমাবেশ নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সমাবেশ নয়। এটি বিশেষ কোনো ছবির বা ব্যক্তির স্বার্থে আয়োজিত সমাবেশ নয়। এটি এটি স্পষ্ট করার আহ্বান যে সেউতা নতি স্বীকার করবে না, সেউতা এগিয়ে যাবে।’

স্বায়ত্তশাসিত এই স্প্যানিশ ভূখণ্ডের প্রেসিডেন্ট জনগণের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করা সত্ত্বেও তিনি ‘প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য’ বজায় রাখবেন বলে উল্লেখ করেন। ভিভাস অবশ্য মনে করেন যে, ২০২১ সালের সীমান্ত সংকট এবং বর্তমান সংকটের পর সরকার ‘একই পাথরে দুইবার হোঁচট খেয়েছে’।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের ওপর ডানপন্থী ও প্রধান রক্ষণশীল দলগুলোর রাজনৈতিক চাপ ও কড়া আক্রমণ উত্তরোত্তর বাড়ছে।

মাদ্রিদ ক্যাপিটাল অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল ডিয়াজ আয়ুসো ইতালির নাগরিকদের স্পেনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমরা কেবল সেউতা দিয়েই ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দিয়েছি, আর ইতালীয়দের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছি, যারা স্পেনে বিনিয়োগ ও অবদান রাখা একটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পশ্চিমের দিক থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি সত্যিই বিস্ময়কর।’

পপুলার পার্টি বা পিপি-এর অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক উপ-সচিব আলবার্তো নাদাল প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিবাসন নীতির কারণে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নে স্পেনকে বিচ্ছিন্ন করার’ অভিযোগ তুলেছেন এবং এ বিষয়ে পার্লামেন্টে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন।

এশত্রেমাদুরা-র প্রেসিডেন্ট মারিয়া গার্দিওলা সরকারের এই প্রতিক্রিয়া ও নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘এশত্রেমাদুরা এই আদর্শগত বিচ্যুতি প্রত্যাখ্যান করে।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এটি অঞ্চলগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা সমস্যা আড়াল করতে ফাটল খোঁজার বিষয় নয়। এটি হলো মানবিকতা, গুরুত্ব এবং জোরালো কণ্ঠের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার বিষয়।’

ইতালির ক্ষোভ ও শেনজেন চুক্তি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বিরোধ

মাদ্রিদ ও রোমের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনা গত রবিবারও অব্যাহত ছিল। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ইতালির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের জবাবে স্পেনের সমান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘দুর্বোধ্য এবং সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন।

ইতালীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাজানি বলেন, ‘সেউতায় এক অসাধারণ ঘটনা ঘটার কারণে আমরা শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছি, যা চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী আমাদের অধিকার।’

ইতালির এই শীর্ষ কূটনীতিক যুক্তি দেখিয়েছেন যে, রোম কেবল ঝুঁকি কেটে গেলেই এই তল্লাশি বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। তিনি পেড্রো সানচেজের বিরুদ্ধে পরিস্থিতিকে আরও ‘উত্তপ্ত’ করার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আমরা স্পেনের বিরুদ্ধে নই, তবে আমাদের সীমানা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে।’

ইতালির বিরোধী দলগুলো অবশ্য প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের একটি ‘ভিত্তিহীন’ কূটনৈতিক সংকট তৈরি করার জন্য কঠোর সমালোচনা করেছে।

স্পেন ও ইতালি উভয়ই ইউরোপীয় কমিশনকে অবহিত করেছে যে তাদের নিজ নিজ সীমান্ত তল্লাশি সাময়িক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার গত শনিবার জানিয়েছেন, উভয় দেশই তাঁকে এই অস্থায়ী প্রকৃতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং ইতালি শিগগিরই এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, স্পেনের নেওয়া পাল্টা এই কড়াকড়ি আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version