রবিবার, ২০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৌরিতানিয়া থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পাঠানোর নামে বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা ও মানবপাচারের অভিযোগে একটি চক্রের বিচার শুরু হয়েছে স্পেনে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৩ হাজার ইউরো করে আদায় করত এই মানবপাচারকারী চক্রটি। তবে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার বদলে তাদের আটলান্টিক মহাসাগরের বিপজ্জনক পথে ছোট নৌকা বা রাবারের নৌকায় তুলে দেওয়া হতো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার মানবপাচারকারী চক্রগুলো এশিয়ায় তাদের অবৈধ অভিবাসন ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এই প্রবণতা মোকাবিলায় স্পেনের পুলিশ মৌরিতানিয়ার জন্দারমেরি বা আধা-সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে। ক্যানারির এল হিয়েরো ও লানজারোতে আসা নৌকাগুলোতেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব নৌকায় মালি, সেনেগাল বা গাম্বিয়ার নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকরাও ছিলেন।

এই চক্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার একটি অংশের বিচার গত বুধবার লাস পালমাস আদালতে শুরু হয়েছে। এই চক্রের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত ৫২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নাগরিক, যাঁর মৌরিতানিয়ায় একাধিক রেস্তোরাঁ ছিল।

মোহামেদ এস.এস. নামের ওই ব্যক্তিকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌরিতানিয়ার কর্তৃপক্ষ স্পেনের কাছে হস্তান্তর করে। স্পেনের পুলিশের অভিযোগ, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মৌরিতানিয়া, সাহারা ও মরক্কো থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে ৭৩টি নৌযান পাঠিয়েছিলেন তিনি। এসব নৌযানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মানুষ ছিলেন এবং সমুদ্রে অন্তত ১৮০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

তদন্তে জানা গেছে, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর অভিবাসনপ্রত্যাশীরা স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে চক্রের সদস্যরা তাঁদের ওপর চরম সহিংসতা চালাতেন, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য ভয়ভীতি দেখাতেন এবং অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করে মারধর করতেন।

এদিকে আগামী সপ্তাহে গ্রান কানারিয়ার রাজধানী লাস পালমাসে এই চক্রের আরেক বাংলাদেশি সহযোগী এস.এম.-এর বিচার শুরু হতে চলেছে। অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তা করার অভিযোগে তাঁর চার বছর নয় মাসের কারাদণ্ড চেয়েছেন সরকারি কৌঁসুলিরা।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালে ফুয়ের্তেভেনতুরা ও গ্রান কানারিয়ায় পৌঁছানো তিনটি নৌকা পরিচালনার সঙ্গে এস.এম. জড়িত ছিলেন, যেগুলোতে ১৪ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন পাকিস্তানিসহ মোট ১৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং চক্রের আরেক নেতা এইচ.এ.-র লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে মৌরিতানিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ২০০ ইউরো করে নিতেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে গ্রান কানারিয়ায় পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি গ্রেপ্তার হন।

স্পেনের পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলিরা জানান, আফ্রিকাভিত্তিক এই মানবপাচারকারী চক্রগুলোর এশিয়া থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশী সংগ্রহ ও ক্যানারি রুট দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর বিশাল নেটওয়ার্ক ছিল। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মূল অভিযুক্তকে মৌরিতানিয়া থেকে স্পেনে প্রত্যার্পণ করা হয়। বিপজ্জনক আটলান্টিক রুটে পাচারকারীদের এই নির্মমতার শিকার হয়ে অনেক মানুষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সাগরে প্রাণ হারিয়েছেন।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version