ইউরোপিয় সীমান্তপ্রহরী সমুদ্র ইংলিশ চ্যানেল ব্যবহৃত হচ্ছে ২১শ শতকের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট হিসেবে, যেখানে মানুষ ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে জীবনের বিনিময়ে ঝুঁকি নিচ্ছে। ২০২৫ সাল এই সংকটকে শুধুমাত্র বিশাল সংখ্যায় নয়, বরং প্রকৃত নিরাপত্তা প্রবণতা, আন্তর্জাতিক নীতির সীমাবদ্ধতা ও মানবিক বাস্তবতার সহিংস সংঘর্ষ হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা, উদ্ধার ও মৃত্যু
ফরাসি উপকূলীয় কর্তৃপক্ষ ম্যারিটাইম প্রেফেকচুর (প্রেমার) জানায়, ২০২৫ সালে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় ফরাসির কাছ থেকে ছোট নৌকায় করে ৪৯ হাজার ৯৬৬ জন অভিবাসী যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৭ জনকে সমুদ্রের বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অন্তত ২৫ জন নিহত এবং ২ জন নিখোঁজ রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভিনদেশী জনেরা যারা যুদ্ধ, দারিদ্র্য, নির্যাতন বা নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছে, কিন্তু সমুদ্রের কঠিন পরিস্থিতি তাদের পরীক্ষা করেছে মারাত্মকভাবে।
ছোট নৌকার বিপজ্জনক বাস্তবতা
বড় নৌকা নয়, ছোট নৌকাই এখন প্রধান মাধ্যম। ফরাসি কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট ৭৯৫টি ছোট নৌকা ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রতিটি নৌকার গড় যাত্রী বর্তমানে ৬৩ জন, ২০২১ সালে যা ছিল মাত্র ২৬ জন। অন্তত ১০টি নৌকায় ১০০ জনের বেশি মানুষ ছিল, যা আগের তুলনায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকা শুধুই অনুপ্রাণিত নয়, জীবনহানির প্রধান কারণও।
মৃত্যু ও বিপদের কারণ
সমুদ্রের শক্তি, ঠান্ডা সাগর, বিশৃঙ্খল নৌকা, এসবই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশেষ করে বড় সংখ্যায় যাত্রী বহন করা হলে নৌকাগুলো স্থিতিশীল থাকে না এবং পানির নিচে চাপ অনুভব করে জরুরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে বেঁচে থাকার সুযোগ কমে যায়। ২০১৮ সাল থেকে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া অভিবাসীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ হোম অফিসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৩ জন অভিবাসী ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়েছে। এই পথে মৃত্যু ও অনিয়মিত আগমন উভয়ই দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সমাধান
২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে এক নতুন কৌশল চালু করে, “একজন আউট হলে একজন ইন” নীতি। এতে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে পৌঁছানো যাত্রীদের ফেরত পাঠানো হবে, আরেকজনকে বৈধ শর্তে আশ্রয়ের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু চ্যানেল পার হওয়া অভিবাসীদের সংখ্যা ভালোভাবেই অব্যাহত আছে। রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসী একই দিনে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছে, একবারের রেকর্ড ১২টি নৌকায় ১ হাজার ৭২ জন অভিবাসী যুক্তরাজ্যে পৌঁছায়। এটি দেখাচ্ছে যে নীতি থাকলেই সমস্যা সমাধান হয় না, বাস্তব প্রয়োগই গুরুত্বপূর্ণ।
যেকারণে মৃত্যুর সংখ্যা কমছেনা
একাধিক কারণে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না, বরং ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এরমধ্যে, প্রথমত রয়েছে নিরাপদ ও বৈধ পথের অভাব। অনেক অভিবাসীর কাছে যোগ্যতা অনুযায়ী নিরাপদ আশ্রয় বা বৈধ পথে যাত্রা করার কোন সুযোগ নেই। তাই তাঁরা অসুরক্ষিত ছোট নৌকাকে ঝুঁকি নিয়েও বেছে নিচ্ছেন। দিতীয়ত হচ্ছে, কঠোর আইন প্রয়োগই উল্টো ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রধান মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সৈকতে কড়া নজরদারি কিছু ক্ষেত্রে বিপদকে আরও বৃদ্ধি করে, ফলে অনেক নৌকা আশু ছুটে যাত্রা করে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই।
নতুন বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা
ইংলিশ চ্যানেল পরিস্থিতি শুধু ইউরোপের সীমান্ত সমস্যা নয়, এটা বিশ্বব্যাপী অন্তঃসার্বিক অভিবাসন, নিরাপত্তা নীতি ও মানবাধিকার সংঘাতের প্রতীক। অভিবাসীরা যুদ্ধ, অত্যাচার, দারিদ্র্য বা রাজনৈতিক জন্মভূমির ভয় থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে চ্যালেঞ্জ শুধু সামুদ্রিক পথ নয়, বরং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব। স্বাধীন আন্তর্জাতিক নীতিবিদরা বলছেন, বৈধ ও নিরাপদ আশ্রয়ের পথ সৃষ্টি করাই দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।
দৃষ্টি ভঙ্গি বদলানো জরুরি
ইংলিশ চ্যানেল অভিবাসন পরিস্থিতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি হলো মানুষ, নীতি ও মানবিক দায়বদ্ধতার সংঘর্ষক্ষেত্র। সমস্যার সমাধান তাই শুধুমাত্র কঠোর সীমান্ত নয়, বরং বৈধ, নিরাপদ ও দ্রুত আশ্রয় প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও দায়িত্ব ভাগাভাগি, মানবিক আশ্রয়ের সুযোগের প্রসার, এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ন্যায়সংগত ও দয়া-ভিত্তিক বাস্তবায়ন।
যাত্রাপথ যতই বিপজ্জনক হোক, বলিষ্ঠ নীতি ও মানবিক সমাধান একসাথে না হলে কোনো স্থায়ী উন্নতি আসবে না।
